Wednesday, March 21, 2018

মাঝির প্রহারে

কথিত আছে যে, এক দিন গঙ্গার উপর নৌকাতে একজন মাঝি আর একজন মাঝিকে প্রহার করিতেছিল। পরমহংস মশাই নিবিষ্ট মনে তাহাদের ঝগড়া দেখিতেছিলেন। অবশ্য এ কথা বলা বাহুল্য যে, তিনি যখন যাহা দেখিতেন, তাহা একাগ্র ও তন্ময় হইয়া দেখিতেন। আঘাতের ফলে প্রহৃত মাঝির গায়ে দাগ উঠিল। ইহাতে তখনই পরমহংস মশাই-এর গায়েও ঠিক ঐ একই স্থানে আঘাতের দাগ দেখা যাইল। হৃদু মুখুজ্যে পরমহংস মশাই-এর গায়ের এই দাগ দেখিয়া মহা আস্ফালন করিতে লাগিলেন এবং যে প্রহার করিয়াছে, তাহাকে সমুচিত দণ্ড দেওয়ার জন্য অত্যন্ত অস্থির হইয়া পড়িলেন। পরমহংস মশাই বলিলেন, "দেখছো না, একটা মাঝি আর একটা মাঝিকে মারলে! তাতেই আমার গায়ে দাগ উঠল।"

এখন প্রশ্ন হইতেছে ইহা অলীক না কাল্পনিক; না ইহার কোনো প্রকৃত অর্থ বা কারণ আছে? আমি একটি যুবকের নিকট অনুরূপ একটি ঘটনার বিষয় শুনিয়াছিলাম।

স্বামীজী পাশ্চাত্য দেশ হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া দার্জিলিঙ-এ গমন করেন। সেখানে এক দিন সকালে চা পান করিয়া দুইটি বালককে সঙ্গে লইয়া তিনি বেড়াইতে যান। স্বামীজীর শরীর তখন মোটামুটি সুস্থই ছিল। স্বামীজী যখন রাস্তায় বেড়াইতে যাইতেন, তখন নিতান্ত একমনা ও তন্ময় হইয়া চলিতেন। চিন্তাশীল লোকদিগের নিয়মই হইল যে, যখন তাঁহারা পায়চারি করেন বা কোনো নির্জন স্থানে যান বা কোনো সুরম্য দৃশ্য দেখেন, তখন তাঁহারা একেবারে তন্ময় হইয়া পড়েন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখিলেই তাঁহাদের মন সাধারণত উচ্চ অবস্থায় উঠিয়া যায়। ইহা প্রত্যেক চিন্তাশীল ব্যক্তিরই স্বাভাবিক ভাব, তাহা না হইলে তিনি চিন্তাশীল হইতে পারেন না।

যাহা হউক, স্বামীজী অগ্রে যাইতেছিলেন, যুবক দুইটি পশ্চাতে ছিল। স্বামীজী সহসা বলিয়া উঠিলেন, "বড্ড ব্যথা লেগেছে কষ্ট হচ্ছে!" যুবক দুইটি জিজ্ঞাসা করিল, "স্বামীজী, কোথায়? কি করে ব্যথা লাগলো?" স্বামীজী কাতরভাবে ও করুণস্বরে বলিলেন, "দেখলি নি পাহাড়ের গায়ে লেগে ঐ মুটে স্ত্রীলোকটা গুমিয়ে পড়েছে। ওর কোমরটায় কী ধাক্কা লাগলো!" এই বলিয়া স্বামীজী কোমরে হাত দিয়া বড় কাতর হইয়া পড়িলেন। আর বেড়াইলেন না, বাড়ি ফিরিয়া আসিলেন, সত্যই কত লাগিয়াছে।

যুবক দুইটির বয়স অল্প ছিল তাহারা মনে করিল - এ আবার কি ঢঙ! এক গাঁয়ে ঢেঁকি পড়ে, আর এক গাঁয়ে মাথা ব্যথা! কোথায় মুটে স্ত্রীলোকটার কোমরে চোট লাগলো, আর স্বামীজীর কোমরে ব্যথা হল। জগতে কত ঢঙই যে আছে তা বলা যায় না! তাহারা মুখে কিছু বলিল না, কিন্তু মনে মনে এইরূপ চিন্তা করিতে লাগিল।

যমজ ভাইদের ভিতরও দেখা গিয়াছে যে, দুই ভাইকে দুই বিভিন্ন স্থানে রাখা হইয়াছে, কিন্তু একজনের শরীরে আঘাত লাগিয়া জ্বর হইলে, অপর ভাইটির অনুরূপ স্থলও সহসা ফুলিয়া উঠিয়া জ্বর হইয়াছে, অথচ অনেক দিন যাবৎ পরস্পরে কেহ কাহাকেও দেখে নাই বা আঘাত লাগার সংবাদও জানে না।

এই সকল ব্যাপার কি করিয়া হয়, ইহাই হইল প্রশ্ন। মন যখন স্থূল-স্নায়ুতে বা স্থূল-শরীরে থাকে, তখন তাহার বিকাশও অতি স্থূলভাবে হইয়া থাকে। স্থূল-শক্তির গতি অল্প সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে বা অল্পপরিধিযুক্ত হয়। এইজন্য স্থূল অবস্থায় বিশিষ্ট ভাব - 'খণ্ড' বা 'দ্বন্দ্ব' অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। ইহা হইল দুঃখ ও অশান্তির কারণ। শান্তি হইল, 'শান্ত' বা সাম্য অবস্থায় উপনীত হওয়া। চিৎ-শক্তি যখন সূক্ষ্ম বা কারণ-স্নায়ুতে প্রবাহিত হয়, তখন খণ্ড বা বিশিষ্ট ভাব চলিয়া যাইয়া সাম্য, একীভূত বা অখণ্ড অবস্থা বিকাশ পায় - জগৎ বা সৃষ্টি যে সর্বত্র এক শক্তি বা এক উপাদান বা এক মূল কারণে পরিব্যাপ্ত, তাহা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়; মাঝখানে কোনো ব্যবধান বা বিচ্ছেদ বলিয়া কিছু থাকে না।

স্বামীজী লন্ডনে বক্তৃতাকালে একবার বলিয়াছিলেন, "স্থূল অবস্থায় সমস্তই বিচ্ছিন্ন ও পৃথক দেখা যায়। স্থূল অবস্থায় যে স্পন্দন উৎপন্ন হয়, তাহা অল্পপরিসরযুক্ত ও তাহার গতি অ-দ্রুত; এইজন্য সর্বত্রব্যাপী কোনো শক্তি থাকে না। কিন্তু মন যখন উচ্চ মার্গে যায় বা কারণ-স্নায়ুতে বা কারণ-শরীরে অবস্থান করে, তখন যে সকল স্পন্দন উঠে, অর্থাৎ যে সকল চিন্তাশক্তি উঠে, তাহা সমস্ত সৃষ্টিময় পরিব্যাপ্ত হয়, কারণ চিদাকাশের প্রক্রিয়া স্থূল প্রক্রিয়া হইতে অন্যবিধ।"

বেতার-বার্তা সূক্ষ্ম-স্পন্দনের সামান্য মাত্র পরিচয় দেয়, কিন্তু ইহা হইতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, সূক্ষ্ম-স্পন্দন বা সূক্ষ্ম-প্রকম্পন, স্থূল-স্পন্দন অপেক্ষা অধিক শক্তিতে পরিপূর্ণ এবং বহু দূর পর্যন্ত ব্যাপ্ত হয়। চিৎ-শক্তিকে যদি আরো উচ্চে, কারণ-অবস্থায় বা মহাব্যোমে উঠানো যায়, তাহা হইলে সেই অবস্থায় যে সকল প্রকম্পন বা স্পন্দন উঠিবে, তাহা বিশ্বব্যাপী হইবে। এই স্থলে মনোবিদ্যা ও বিজ্ঞানশাস্ত্র একীভূত হইয়া যায়। মানুষের দেহ হইল অতি সূক্ষ্ম জীবন্ত যন্ত্র, যাহার দ্বারা এই সকল সূক্ষ্ম-স্পন্দনের কার্য-কারণ পরীক্ষা করা যাইতে পারে - Human body is the most delicate living instrument for experimenting the finer vibrations and their causes.

স্বামীজী যখন এই সূক্ষ্ম-স্পন্দনের বিষয় বক্তৃতা করিতেছিলেন, তখন তিনি অন্য প্রকার হইয়া গিয়াছিলেন। সকল বস্তুকেই তিনি যে স্পর্শ করিয়া রহিয়াছেন, তিনি যে বিশ্বব্যাপ্ত, সর্বত্রই রহিয়াছেন ও সর্ব বস্তুর সহিত সংশ্লিষ্ট - ইহাই তিনি বিশেষ করিয়া বুঝাইতে লাগিলেন। আর একটি বক্তৃতায় তিনি এই বিষয় বলিয়াছিলেন, "I am in the Sun, I am in the Moon, I am in the stars, I am everywhere." - অর্থাৎ, আমি সূর্যতে রহিয়াছি, আমি চন্দ্রতে রহিয়াছি - আমি সর্বব্যাপ্ত। আর একবার তিনি বলিয়াছিলেন, "I am a voice without form" - আমি বাণী, দেহ নহি।

স্থূল-দেহে বা স্থূল-স্নায়ুতে এই সকল ভাব বা উক্তি প্রযোজ্য নয়। কারণ বা মহাকারণে চিৎ-শক্তি উঠিলে, জগতের প্রত্যেক বস্তুর ভিতর যে কারণ বা মহাকারণ অন্তর্নিহিত আছে এবং কারণ বা মহাকারণ হইতেই যে প্রত্যেক বস্তু সৃষ্ট হইয়াছে, তাহার দ্বারাই যে পরিব্যাপ্ত ও পরিপূর্ণ হইয়া রহিয়াছে - ইহাই স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয়। প্রত্যেক সৃষ্ট বস্তু যেমন মহাকারণ হইতে আসিয়া স্থূল অবস্থা ধারণ করিয়াছে, তেমন প্রত্যেক বস্তুতেই মহাকারণ বা আদিকারণ বা আদিশক্তি অন্তর্নিহিতভাবে রহিয়াছে। মানুষের দেহও সেইরূপ আদিকারণ হইতে উৎপন্ন হইয়া পরিশেষে স্থূল রূপ ধারণ করিয়াছে। কারণ ও মহাকারণে চিৎ-শক্তি তুলিলে, মানুষের দেহ ও অপর সৃষ্ট বস্তুসমূহ সেই একই মহাকারণের বিভিন্ন রূপ বলিয়া পরিগণিত হয়। মহাকারণ হইল, Substratum - আধার। শ্রীশ্রীচণ্ডীতে আছে:

"আধারভূতা জগতস্ত্বমেকা
মহীস্বরূপেণ যতঃ স্থিতাঽসি।"1

প্রথম অবস্থায় আমরা দুইটি বস্তুর মধ্যে ব্যবধান দেখিয়া থাকি। 'দুইটি পরমাণু' - এইরূপ শব্দ যদি প্রয়োগ করি, তাহা হইলে, অতি সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করিলে দেখিতে পাই যে, মাঝখানে একটি ফাঁক বা ব্যবধান আছে ... এই ভাবটি মনে আসিয়া থাকে; আর দুইটি বিন্দুর পৃথক Location বা পৃথক অবস্থিতি এবং সীমা ও পরিধির বিষয় স্বতঃই মনে আসে। এক বিন্দু হইতে অপর বিন্দুতে যাইতে হইলে মাঝখানে একটি শূন্য বা অনিশ্চিত ভাব বা ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। পৌরাণিক ভাষায় ইহাকেই 'ভবসাগর' বলা হইয়াছে। ভবসাগর যে কি করিয়া উত্তীর্ণ হইতে হইবে, তাহার জন্য সকলেই ব্যতিব্যস্ত।

এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, এই ব্যবধানটি কি? - এক বিন্দু অপর বিন্দু হইতে অন্যত্র যাইতেছে, বিপরীত দিকে উভয়ের গতি - ইহাই হইল 'দূরত্ব'। কিন্তু, 'ব্যবধান' হইল সাম্য-অবস্থার কথা, এই স্থলে পরিধির কোন চিন্তা নাই। দুইটি বিন্দুর সীমাবিবর্জিত ব্যবধান চিন্তা করাও যাহা, আর সমস্ত সৃষ্টি যে অব্যক্তভাবে অবস্থিত, ইহা চিন্তা করাও তাহাই - দুইই এক হইয়া যায়। এতদ্-অনুসারে, পরিদৃশ্যমান জগৎ লোপ হইয়া যায়, নিজের দেহও লোপ হইয়া যায়, চিন্তাশক্তিও লোপ হইয়া যায়, মাত্র সত্তা অবস্থান করে। সেই সত্তা সর্বত্র পরিব্যাপ্ত এবং সেই সত্তা হইতেই পুনরায় সমস্ত সৃজন হইতেছে, পুনরায় সেই সত্তাতেই সমস্ত সৃষ্ট বস্তু মিলাইয়া যাইতেছে। দুইটি পরমাণুর মধ্যস্থিত যে ব্যবধান, তাহার সাম্য-অবস্থা চিন্তা করা এবং সমস্ত জগৎ সৃজন করা - একই হইয়া যায়। এই স্থলে প্রত্যেক বিন্দুই হইল কেন্দ্র, বিশেষ কেন্দ্র কোনো স্থানে নাই - Every point is a centre, nowhere is the centre. কারণ শক্তি সর্বব্যাপ্ত; শরীরের যে কোনো স্থান দিয়া চিন্তা করা যাইতে পারে এবং সেই স্থানটি কেন্দ্র হইতে পারে; বিশেষ কেন্দ্র বলিয়া কিছুই থাকে না। এই সকল হইল দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক মত। ইহা যদিও জটিল, কিন্তু ইহা প্রকৃতরূপে সমস্ত বিষয় স্পষ্টভাবে পরিদর্শন করিতে সাহায্য করে।

অতি সূক্ষ্ম বা কারণ অবস্থায় সমগ্র সৃষ্টির প্রত্যেক বস্তু পরস্পর পরস্পরকে স্পর্শ করিয়া থাকে, সংলগ্ন হইয়া থাকে; একে অন্যের সহিত অভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট হইয়া থাকে। এইজন্য, এক জায়গায় স্পন্দন উঠিলে, অপর এক জায়গায় স্পন্দন প্রতিফলিত ও প্রতিবিম্বিত হয়। যাহা কারণ ও মহাকারণে স্পন্দিত হয়, অবশেষে তাহা স্থূলে পরিব্যাপ্ত হয়। পরমহংস মশাই-এর গায়ে যে কেন প্রহারের দাগ পড়িয়াছিল, বা স্বামীজীর কোমরে যে কেন ব্যথা লাগিয়াছিল, ইহাতে তাহা বেশ স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। স্বামীজী যে মহাকারণ-স্পন্দনের ব্যাখ্যা করিয়াছিলেন, বর্ণিত ঘটনা দুইটি তাহার স্পষ্ট উদাহরণ।

কারণ ও মহাকারণের প্রক্রিয়া পরমহংস মশাই-এর স্থূল দেহে প্রতিফলিত ও প্রতিবিম্বিত হইয়াছিল। মাঝির ও তাঁহার দেহের মধ্যে যে ব্যবধান ছিল, তাহা শূন্য নয়, তাহা সংযোজক শক্তিতে পরিপূর্ণ। এইজন্য, এক কেন্দ্রের স্পন্দন অপর কেন্দ্রে প্রতিবিম্বিত হইল। পরমহংস মশাই যে কত উচ্চ অবস্থায় উঠিয়াছিলেন, তাহা ঘটনাটিতে প্রতীয়মান হয়।


1. তুমিই জগতের একমাত্র আশ্রয়স্বরূপা, যেহেতু তুমি ক্ষিতিরূপে অবস্থিতি করিতেছ।

No comments:

Post a Comment