Thursday, June 28, 2018

পুরাতন বাংলার সমাজ

পুরানো বাংলার সমাজের অবস্থা অতীব কদর্য ও জঘন্য হইলেও, আমি তাহার কিঞ্চিৎ আভাস দিতেছি। কারণ, সেই সময়কার সমাজের বিষয় অবগত হইলে, শ্রীরামকৃষ্ণের উক্তি ও বাণীসমূহের সার্থকতা বুঝা যাইবে এবং তাঁহার আবির্ভাবের কারণও বুঝা যাইবে।

আমরা যে সময় জন্মগ্রহণ করিয়াছি, সেই সময় পুরানো বাংলার অবসান হইতেছে এবং নূতন বাংলা উঠিতেছে। এইরূপ সামাজিক পরিবর্তনের সময়ে আমরা আসিয়াছি। আমরা সমাজের অতি জঘন্য অবস্থাতে জন্মগ্রহণ করিয়াছি, এবং স্বচক্ষে এমন অনেক বিষয় দেখিয়াছি, যাহা এখনকার সহিত তুলনা করিলে লোকে হাসিবে ও অবজ্ঞা করিবে। আর সমাজের এত দ্রুত পরিবর্তন হইতেছে যে, এখনকার লোকেরা সে-সকল কথা বিশ্বাস করিতেই পারিবে না।

কলিকাতার তখনকার সমাজ বুঝিতে হইলে, দীনবন্ধু মিত্র প্রণীত 'সধবার একাদশী' গ্রন্থখানি পাঠ করা আবশ্যক। ইহা পাঠ করিলে, শিক্ষিত ভদ্রলোকের ভিতর কিরূপ বিপর্যস্ত ভাব আসিয়াছিল, তাহা বেশ বুঝা যায়। তখনকার সমাজের অতি সুন্দর চিত্র ইহাতে আছে। অপর একখানি গ্রন্থ হইল, গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রণীত 'চৈতন্য-লীলা'। ইহাতে জগাই ও মাধাই-এর যে অংশ আছে, তাহা গিরিশচন্দ্র কর্তৃক পর্যবেক্ষিত সমাজের প্রতিচিত্র। আমরাও ঠিক এইরূপ দেখিয়াছি। চৈতন্য-লীলাতে জগাই ও মাধাই-এর যে চরিত্র দেখানো হইয়াছে, তাহা অনেকাংশে গিরিশচন্দ্রের নিজ চরিত্রেরই রূপান্তর। জগাই ও মাধাই হইলেন গিরিশচন্দ্র স্বয়ং ও তাঁহার এক বন্ধু, নাম পরিবর্তিত মাত্র। গিরিশচন্দ্র প্রণীত 'সীতার বিবাহ' গ্রন্থে সমাজের আর একটি আলেখ্য পাওয়া যায়। আমরা ছেলেবেলায় কলিকাতার সমাজের অবস্থা যেরূপ দেখিয়াছি, তাহার নিখুঁত চিত্র ইহাতে পাওয়া যায়।

আলমবাজারের মঠে বড় ঘরটিতে, সন্ধ্যার পর, রাখাল মহারাজ1 ও আমি বসিয়া আছি; এমন সময়, * * মুখুজ্যে ও তাঁহার ছেলে আসিলেন। রাখাল মহারাজ তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "তুমি তো আগে এত ষণ্ডা ছিলে, তবে এত পটকে গেলে কেন?" * * মুখুজ্যে তাঁহার ছেলের সম্মুখেই নিজ জীবনের পূর্ব কথার উল্লেখ করিয়া বলিলেন, "আর দাদা, ছ-ছ'টা ভৈরবীচক্রে রাতে ঘুরতুম। তখন দক্ষিণেশ্বরে, আলমবাজারে, অনেক ভৈরবীচক্রের আড্ডা ছিল। রাতে পাঁচ-ছ'টা চক্রে ঘুরলে, আর কি শরীর থাকে!" * * মুখুজ্যে তাহার পর অতি জঘন্য কথা বলিতে লাগিলেন, এত জঘন্য যে, তাহা শুনিয়া আমাদের ভিতর একটু ত্রাস আসিতে লাগিল। আমরা উভয়ে চঞ্চল ও উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলাম। কথা থামাইবার জন্য রাখাল মহারাজ বলিলেন, "মুখুজ্যে তোমার ছেলে বসে আছে, কি করছো?"

* * মুখুজ্যে ছেলের দিকে মুখ ফিরাইয়া বলিলেন, "এ সব বাপের কথা - মহাভারতের কথা শুনতে কোনো দোষ নেই।"

শিমলা এবং কাঁসারীপাড়াতেও এইরূপ ভৈরবীচক্রের আড্ডা ছিল। আমরা ছেলেবেলায় এই সকল ভৈরবীচক্রের লোকদিগের চালের ধামা উল্টাইয়া দিয়াছি এবং অনেক মারপিটও করিয়াছি। আমরা নূতন কলিকাতার এক প্রকার প্রথম পর্যায়; এইজন্য, পুরানো হীন আচার-পদ্ধতিসমূহ এত ঘৃণা করিতাম ও ভৈরবীচক্রের লোকদিগকে মারপিট করিতাম। এইরূপ মার দেওয়াতে, ভৈরবীচক্রের দল প্রকাশ্যে কিছু কমিয়াছিল। বোষ্টমী নাম দিলে লোকে বিশেষ আপত্তি করিবে না, এইজন্য, পরে, এই ভৈরবীচক্রগুলি নাম পরিবর্তন করিয়া 'শচীমা-ভজা' দল বলিয়া আত্মপরিচয় দিত। এই সব আখড়াগুলিতে অতি বীভৎস কার্য হইত।

মাতালের কথা তো বলিবারই নয়। সেই সময় শিক্ষিত ভদ্রলোকদিগের ভিতর মদ খাওয়ার প্রথাটা খুব চলিয়াছিল। শিমলা ছিল 'অষ্ট-বসুর পাড়া',2 অর্থাৎ, বিখ্যাত মাতালের পাড়া। রাখাল3 ও আমরা সকলে, শনিবার সন্ধ্যার সময় লাঠিসোঁটা লইয়া তৈয়ার হইতাম, তাহার পর, মাতালদের ঠেঙানো শুরু হইত। রাস্তার দু-ধারে তখন পগার বা নর্দমা ছিল। দু-একটি ধাঙড়ে উহা পরিষ্কার করিত। সেই পগারের ভিতর মাতালদের শুইয়া থাকিবার জায়গা ছিল। রবিবার দিন মাতালেরা রাস্তার ধারের এই পগারে, পাঁকের ভিতর, মাথায় ধাঙড়দের ঝোড়া দিয়া বালিশ করিয়া শুইয়া থাকিত; সোমবার সকালে যে যার কাজে যাইত। তখন প্রচলিত কথাই ছিল:

"হায় রে মজা শনিবার
বড় মজার রবিবার!"

পাঁকে শুইয়া থাকিবার সময় যদি পাহারাওলা আসিত, তাহা হইলে ঐ ভদ্রলোক মাতালেরা বলিত, "বাবা, এ police jurisdiction নয় যে ধরবে, এ municipal jurisdiction" - অর্থাৎ এ (পগারটা) পুলিসের এলাকা নয় যে ধরবে, এ মিউনিসিপ্যাল এলাকা।

কাদামাটির কথা কিছু জানা আবশ্যক। দুর্গাপূজার নবমীর দিন, পাঁঠা বা মহিষ বলি দিয়া, তাহার মুণ্ডটি কাদা মাখাইয়া মাথায় করিয়া লইয়া, সকলে রাস্তায় বাহির হইত; আর বৃদ্ধ পিতামহ তাঁহার পৈতৃক খাতাখানি লইয়া অশ্লীল গান শুরু করিতেন, এবং তাঁহার পুত্রপৌত্রাদি সকলে সমস্বরে সেই গান গাহিতে থাকিত। এখন সে সকল কুৎসিত বিষয় স্মরণ করিলে গা শিহরিয়া উঠে! কিন্তু ইহাই ছিল তখনকার সমাজের প্রথা।

তাহার পর হইল, পাঁচালি ও তরজার গান। সে সকল গান অতি কদর্য ও অশ্লীল। কিন্তু তখনকার লোকেরা হাসিমুখে, আনন্দ করিয়া, সেই সকল গান শুনিত। এখন সে সকল গান গাহিলে, সম্ভবতঃ পুলিসে ধরিবে। কলিকাতার সমাজে তখন এত দূর অবনতি হইয়াছিল।

লোক মরিলে, কেহ তাহাকে দাহ করিতে যাইত না। এমন কি, যে বিবাহ করে নাই, সেও বলিয়া বসিত যে, তাহার স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা, সেইজন্য সে মড়া ছুঁইবে না ও দাহ করিতে যাইতে পারিবে না। বাড়ির পাশে লোক মরিলে, মড়া উঠিত না। এমন কি জ্ঞাতি মরিলেও সহজে কেহ সঙ্গে যাইত না। যাহাকে সেবা ও শুশ্রূষার ভাব বলে, সে সব কিছুই ছিল না। কোনো রকমে নিজের জাত বাঁচাইলেই হইল। এ সব কথা সত্য, আমি স্বচক্ষে এ সব দেখিয়াছি।

সর্ব বিষয়ে প্রবঞ্চনা করা, মিথ্যা ব্যবহার করা, জালিয়াতি করা, বিধবাকে ঠকানো, প্রভৃতি ছিল বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। লোকের বিষয়-সম্পত্তি জাল করিয়া লওয়া, ঠকাইয়া লওয়া - এই সব ছিল বাহাদুরির কার্য। ইহা ব্যতীত লোকে যে আরো কত গর্হিত কার্য করিত, তাহা বলিবার নয়। সকল কথা এ স্থলে বলাও উচিত নয়।

মেয়েদের আট বৎসর হইতে নয় বৎসরের মধ্যে বিবাহ হইত। ছেলেদেরও বিবাহ হওয়া চাই-ই। ষোল-সতেরো বৎসরের ছেলে বিবাহ না করিলে জাত যাইবে, এমন কি যেন আকাশ ভাঙিয়া পড়িবে! আমার নিজের বেলায় ঠিক এইরূপ হইয়াছিল। আমি যখন সতেরো বৎসরে বিবাহ করিলাম না, তখন পাড়ায় এক মহা হুলুস্থুল পড়িয়া গেল। ভদ্রলোকেরা তো সেজন্য নিন্দা করিলেনই, এমন কি আমাদের বুড়ী কাদী হাড়িনী, যে আমাদের বাড়ির ময়লা পরিষ্কার করিত, সেও আসিয়া আমাকে ভর্ৎসনা করিয়া গেল। এখন কিন্তু শহরে হাজার হাজার ছেলে বিবাহ করিতেছে না। আর, এখন মেয়েরাও অবিবাহিতা থাকে। এখন মেয়েদের রাস্তায় বাহির হওয়া গা সওয়া হইয়া গিয়াছে। মেয়েরা তখন পালকি করিয়া রাস্তায় বাহির হইত; পালকির মাথায় ঘেরাটোপ দেওয়া থাকিত। গঙ্গাস্নান করিবার সময় বেহারারা পালকিখানি গঙ্গার জলের উপর ধরিত এবং পালকির নীচুকার বেতের ছাউনির ভিতর দিয়া জল ঢুকিলে মেয়েরা ভিতরে বসিয়া স্নান করিত।

বংশ ও জাত বিষয়ে অতি কঠোর নিয়ম ছিল। নিমন্ত্রণ ও আহার বিষয়েও ঘোর সমস্যা ছিল। নিমন্ত্রণ করিতে যাইলে, প্রথমে সাত পুরুষের পরিচয় দিতে হইত, তাহার পর, কে নিমন্ত্রণ করিতে আসিয়াছে, সে নিমন্ত্রণ করিবার উপযুক্ত কি না, তাহার মারফৎ নিমন্ত্রণ গ্রহণ করা যাইতে পারে কি না, এবং যে নিমন্ত্রণ করিতে পাঠাইয়াছে, তাহার বাড়িতে খাওয়া যাইতে পারে কি না - এই সব বিষয় লইয়া মহা গণ্ডগোল হইত। আমি ছেলেবেলায় নিমন্ত্রণ করিতে গিয়া বৃদ্ধদের হাতে পড়িয়া কয়েক বার এইরূপ বিপন্ন হইয়াছিলাম; শেষে, রাগিয়া চলিয়া আসি।

ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ কখনো ভাগবতের কথা শুনিতে যাইতেন না; ইহাতে তাঁহার মানহানি হইত। ভাগবত গ্রন্থ তখন হাতে-লেখা পুঁথি ছিল। এমন কি, পুঁথির একখানি পাতা যদি দৈবাৎ খুলিয়া পড়িয়া যাইত তো, ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ চিমটা দিয়া ধরিয়া পাতাটা তুলিয়া রাখিতেন এবং ভাগবতের পাতা ছুঁইয়াছেন বলিয়া, হাত ধুইয়া, ইষ্টনাম জপ করিতেন। গোঁসাই-এর সহিত কোনো ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ এক পঙ্ক্তিতে আহার করিতেন না; কোনো শ্রাদ্ধবাড়িতে গোঁসাই-এর সহিত এক আসনে বসিতেন না। আবার, গোঁড়া বৈষ্ণবেরা দুর্গাঠাকুরকে বলিতেন, 'হাতিমুখোর মা'; বেলপাতাকে বলিতেন 'তেফর্কা পাতা'; কালীঠাকুরকে বলিতেন, 'মসী'। এইরূপ গোঁড়ামির অনেক পুরানো গল্প আছে।

অনেক সময় লোকেরা তখন ইংরাজী ও বাংলা মিশাইয়া কথা বলিত। বাংলায় চিঠি লেখা অতি অসভ্যতা বলিয়া বিবেচিত হইত। "সধবার একাদশী"-তে নিমচাঁদ তাই বলিতেছে: I read English, write English, talk English, speechify in English, think in English, dream in English... আর এক স্থানে নিমচাঁদ বলিতেছে: "তুমি পড়েছ দাতাকর্ণ, তোমার বাপ পড়েছে কাশীদাস। তোমার হাতে মেঘনাদ, কাঠুরের হাতে মাণিক - মাইকেল দাদা বাঙ্গলার মিল্টন॥"

প্রণাম করা ছিল কু-সংস্কারের বিষয়। কেহ বা ইংরাজীতে 'গুড মর্নিং' বলিয়া কার্য সমাধা করিত, কেহ বা বিশেষ ভদ্রতা অনুযায়ী ডান হাতের তর্জনীটি এক বার কপালে তুলিত, ইহাই ছিল তখনকার সভ্যতার পরিচয়। শ্রাদ্ধাদি করা হইল কু-সংস্কারের কার্য, ইহার কোন দরকার নাই! দেবদেবীর পূজা করাও যেন অতীব গর্হিত কার্য! ঠাকুর-দেবতার কথা শোনাও ছিল কু-সংস্কার! কালীপূজার সহিত ভৈরবীচক্রের বিশেষ সম্পর্ক ছিল, এইজন্য, কালীঠাকুর অনেকের কাছে বিশেষ করিয়া বর্জনীয় ছিল। আর, সরস্বতী ও কার্তিক পূজা ছিল বেশ্যাপল্লীর পূজা, ভদ্রলোকদিগের এই সকল পূজা করা ছিল অবিধেয়।

ধর্ম-উপদেষ্টা নামে, কথক ঠাকুর ও গাইন ঠাকুর কথকতা ও পালাগান করিত। বৃদ্ধ ও বৃদ্ধারা তাহাদের কথকতা ও পালাগান শুনিতে যাইতেন; অন্যান্য ভদ্রলোকরা কখনো যাইতেন না। কথাবার্তার প্রচলিত মাত্রাই ছিল - 'এ যেন কথকের কথা', অর্থাৎ বিশ্বাসযোগ্য নয়।

ধর্মগ্রন্থ যাহা কিছু ছিল এবং ধর্ম সম্বন্ধে যাহা কিছু শুনিতে পাইতাম, তাহা হইল - যীশুখ্রীষ্টের গল্পবিষয়ক। পাদরীরা, এই সুযোগে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে ও বাজারে যাইয়া সকলকে যীশুর গল্প শুনাইত। বাঙালি পাদরীরা, হেদোর4 ধারে, কেষ্ট বন্দ্যোর5 গির্জার কোণটিতে, রবিবার সকালে যীশুখ্রীষ্টের কথা বলিত, আর হিন্দু দেবদেবীদিগকে গাল পাড়িত। দাদা6 একদিন বেলা নয়টার সময় ঐখান দিয়া আসিতেছিল। সে খানিকক্ষণ পাদরীদের বক্তৃতা শুনিয়া তাহাদের সহিত তর্ক-বিতর্ক করিয়া ঝগড়া শুরু করিল। ঝগড়াটা ক্রমে বাড়িয়া উঠিল। দুই দিকে বেশ দল পাকিল; এমন কি, মারামারি হইবার উপক্রম হইল। পরে, দুই দল ঠাণ্ডা হইলে, দাদা চলিয়া আসিল এবং দুই দলের লোকরাও রাগিয়া চলিয়া গেল।

এইরূপে খ্রীষ্টান পাদরীরা সকলকে খ্রীষ্টান করিবার জন্য বিশেষ প্রয়াস পাইতে লাগিল। ইংরেজ পাদরী ও সহকারী দেশীয় পাদরীর সংখ্যা খুব অধিক বাড়িয়া গিয়াছিল। তাহারা গলির মোড়ে মোড়ে, বাজারে ও নানা স্থানে যাইয়া হিন্দুধর্ম ও হিন্দু-সমাজের কুৎসা ও অসারতা প্রচার করিতে লাগিল। পাদরীরা বলিত যে, গঙ্গাস্নান করা কু-সংস্কার; তেল মাখিয়া স্নান করা কু-সংস্কার; দাড়ি কামানো কু-সংস্কার। - এইজন্য, আমরা দাড়ি কামাইতাম না। - তাহারা বলিত, হিন্দুদের যাহা কিছু আছে, তাহাই কু-সংস্কার; শুধু তাহারা যাহা বলিবে, তাহাই যুক্তিসঙ্গত। হিন্দুধর্ম মানেই হইল, কু-সংস্কার, হিন্দুধর্ম মানেই হইল, যাহা কিছু সব ভুল!

হিন্দুধর্ম যে কি, তাহা অনেকেই তখন বুঝিত না। হিন্দুধর্ম সম্বন্ধে কাহারো বিশেষ কিছু পড়া-শুনা ছিল না, এবং হিন্দুধর্মের বিষয় কোনো গ্রন্থও তখন পাওয়া যাইত না। এইজন্য, পাদরীদের কথার উত্তর দেওয়া দুঃসাধ্য ছিল। আবার, পাদরীরা ছিল ইংরেজ। পাদরীদের কিছু বলিলে, পাছে হাঙ্গামা হয়, সেইজন্য সাহস করিয়া কেহ বিশেষ কিছু বলিতে পারিত না। নরেন্দ্রনাথ যে সাহস করিয়া হেদোর ধারে পাদরীদের সহিত তর্ক-বিতর্ক করিয়াছিল, সেরূপ সকলে পারিত না। য়ুরোপীয় রাজনীতিক্ষেত্রে একটি উক্তি আছে: First send the missionaries, then send the merchants and last send the army. ইহার অর্থ এই যে, একটি দেশ জয় করিতে হইলে, প্রথমে ধর্ম-প্রচারকদিগকে পাঠাইবে, পরে বণিকদিগকে এবং সর্বশেষে সৈন্যদলকে পাঠাইবে। ভারতবর্ষেও ঠিক সেইরূপ হইয়াছিল। এইজন্য, পাদরীদিগকে আমরা সশঙ্কচিত্তে দেখিতাম; শ্রদ্ধা-ভক্তির কথা নয়, অতিশয় ভয় করিতাম; কারণ ভাবিতাম, তাহারা কখন কি বিপত্তি আনিয়া দিবে? গ্রাম্য ভাষায় তখন একটি কথা প্রচলিত ছিল:

'জাত মাল্লে পাদরী এসে
প্যাট্ মাল্লে নীল বাঁদরে।'

অর্থাৎ পাদরীরা আসিয়া জাত ও ধর্ম নষ্ট করিল, এবং নীলকরেরা উদরের অন্ন হরণ করিল।

শ্রীচৈতন্য ও বৈষ্ণব-ধর্মের বিষয় আমরা বিশেষ কিছু জানিতাম না। গীতা ও উপনিষদের নাম কেহ শুনে নাই। চণ্ডীপাঠ মাত্র কয়েকজন ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ করিতেন। ত্রৈলোক্য সান্যাল মশাই7 শ্রীচৈতন্যের বিষয় একটি গ্রন্থ8 লিখিয়াছিলেন। আমরা শ্রীচৈতন্য সম্বন্ধে প্রথম এই গ্রন্থ পাঠ করি। 'চৈতন্য-চরিতামৃত'9 নামে যে কোনো গ্রন্থ আছে এ বিষয় আমরা তখন কিছুই জানিতাম না। পাদরীরা বাইবেলগুলি বাড়ি বাড়ি দিয়া যাইত, সেইটাই আমাদের কতকটা পড়া ছিল মাত্র।

আবার, এক মত উঠিল কোঁতিষ্টদের। ইহাদের মত হইল যে, ঈশ্বরাদি কিছুই নাই। ইহাদের প্রত্যক্ষবাদী - Positivist বলা হইত। ব্রাহ্ম-ধর্ম তবু একটা ধর্মের ভিতর ছিল, কিন্তু প্রত্যক্ষবাদীরা সব উড়াইয়া দিত।

কলিকাতার যখন এইরূপ অবস্থা, তখন কেশববাবু10 বক্তৃতা দিতে লাগিলেন। কেশববাবুর বিষয় কিছু বলিতে হইলে ইহা প্রথমেই বলা আবশ্যক যে, তাঁহার চেহারা ও মুখশ্রী কার্যকারিতা বা সফলতা লাভে তাঁহাকে বারো আনা ভাগ সাহায্য করিত, এবং বাকি চার আনা ভাগ সাহায্য করিত তাঁহার বাক্যবিন্যাস। আলেখ্যে11 তাঁহার যে মূর্তি দেখা যায়, তাহা শুধু একভাব হইতে দেখানো হইয়াছে, কিন্তু কেশববাবুর জীবিত অবস্থায় চেহারা আরো সুন্দর ও মাধুর্যপূর্ণ ছিল। চোখের চাহনী ও মুখভঙ্গী - ভক্তি, ঈশ্বর-বিশ্বাস ও ওজস্বিতার ভাবে পরিপূর্ণ ছিল। কেশববাবুকে দেখিয়াছেন এমন কোনো লোক যদি আজও জীবিত থাকেন তো, তিনি নিশ্চয়ই বলিবেন যে, কেশববাবুর চেহারাতে একটি বিশেষ লাবণ্য বা মাধুর্য ছিল, এবং সাধারণ লোক হইতে তাঁহার চেহারার অনেক অংশে প্রভেদ ছিল।

পাদরীরা যেমন পাড়ায় পাড়ায় গিয়া বক্তৃতা দিত কেশববাবুও তেমনি পাড়ায় পাড়ায় গিয়া, মধ্যে মধ্যে সভা করিয়া, হিন্দুধর্ম প্রচার করিতে লাগিলেন। কেশববাবু প্রথম অবস্থায় ইংরাজীতে বক্তৃতা দিতেন, কিন্তু কিছু দিন পর হইতে বাংলায় বক্তৃতা দেওয়া আরম্ভ করিলেন। আমরা কেশববাবুর নিকট প্রথম বাংলায় বক্তৃতা শুনিয়াছিলাম; তাহা নিন্দনীয় নয়। শিমলাতে মনোমোহনদার12 এবং নন্দ চৌধুরীর বাড়িতে এক সময়ে তিনি সভা করিয়াছিলেন: সমস্ত দেশটা যাহাতে খ্রীষ্টান না হইয়া যায়, তাহার জন্য তিনি বিশেষ প্রয়াস পাইতে লাগিলেন। প্রথম অবস্থায় তিনি খ্রীষ্টধর্ম ও হিন্দুধর্মের মাঝামাঝি একটি সেতু তৈয়ার করিতে চেষ্টা করিলেন। যীশুকে তিনি Oriental Christ - প্রাচ্যদেশীয় যীশু ও তপস্বী যীশু করিয়া দেখাইতে লাগিলেন। তিনি কতকগুলি বক্তৃতা দিলেন। বক্তৃতাগুলিতে তিনি এইরূপ মত প্রকাশ করিলেন যে, বিলাতী হ্যাট-কোট ত্যাগ করাইয়া দেশী যীশু করো এবং যীশুবিহীন যীশুর ধর্ম মানো। কেশববাবু হিন্দুধর্মের বিগ্রহ-পূজাদি ত্যাগ করিলেন, কিন্তু ভক্তির পথ অবলম্বন করিলেন। ইহাতে শিক্ষিত লোকের ভিতর খ্রীষ্টান হওয়া কিছু পরিমাণে কমিয়াছিল। ব্রাহ্মধর্মে কিছু পরিমাণ খ্রীষ্টধর্ম ও কিছু পরিমাণ হিন্দুধর্মের আচার-পদ্ধতি মিশানো ছিল। কেশববাবু তাঁহার ব্রাহ্ম মত প্রচার করিতে লাগিলেন। অধিকাংশ শিক্ষিত লোকই তখন প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে কেশববাবুর দলে যাইতে লাগিলেন। আমরাও সমাজ-সংস্কার বিষয়ে তাঁহার অনুগত হইলাম। কেশববাবুর দলে যোগদান করায়, যদিও মদ খাওয়া ও অন্যান্য সামাজিক দুর্নীতি হইতে আমরা অন্য দিকে যাইলাম; কিন্তু এক দিকে নিরাকার ব্রহ্ম যে কি, তাহা কিছুই বুঝিতাম না, এবং অপর দিকে, ঠাকুর-দেবতা ও পুরানো আচার-পদ্ধতিও কিছু মানিতাম না।

সমাজের এইরূপ অবস্থাতে আমাদের শৈশবকাল কাটিয়াছিল। সমাজে তখন নাস্তিকতা ও বিশৃঙ্খলতার ভাব আসিয়াছিল। অনেক শিক্ষিত যুবক এইরূপ অনিশ্চিত অবস্থায় থাকিয়া, শেষে খ্রীষ্টান হইয়াছিল। কিন্তু আমরা অধিকাংশ যুবক খ্রীষ্টধর্ম পছন্দ করিতাম না ও হিন্দুধর্মও মানিতাম না। আমরা পুরানো কিছু মানিতাম না; নূতন যে কি করিতে হইবে, তাহাও জানিতাম না। আমরা কোনটা যে ধরিব, তাহা তখন স্থির করিতে পারিতেছিলাম না; মহা অশান্তির ভাব আসিল। যুবকদের মনে প্রচণ্ড আগুন জ্বলিল। কি করিতে হইবে; তাহা কেহই বুঝিতে পারিতেছিল না। পুরানো বাংলা তখন চলিয়া যাইতেছিল এবং নূতন বাংলা আসিতেছিল।

কেশববাবু বাংলাদেশে প্রথম নব ভাব জাগ্রত করিলেন। তিনি, 'ব্যান্ড অভ্ হোপ' (Band of Hope) নামে একটি দল গঠন করিলেন। দলের লোকেরা মদ খাইবে না; এমন কি, তামাকও খাইবে না। নরেন্দ্রনাথ এই ব্যান্ড অভ্ হোপ বা 'আশার দল'-এ নাম লিখাইয়াছিল। তবে, এই দলের ভিতর কলিকাতার যুবক তত বেশী ছিল না; পূর্ববঙ্গের অনেক লোক ছিল।

এক দিন নরেন্দ্রনাথ তামাক খাইতেছে, এমন সময়, প্রিয় মল্লিক নামে কেশববাবুর সমাজভুক্ত জনৈক যুবক আসিয়া বলিল "নরেন, তুমি কি করলে, তামাক খেলে?" - তামাক খাওয়াটা যেন একটা মহা গর্হিত কাজ! নরেন্দ্রনাথ হাসিয়া বলিল, "আরে, ব্যান্ড অভ্ হোপ-এর দলে থাকলেও তামাক খেতে দোষ নেই।" এই বলিয়া কথাটি ঠাট্টা করিয়া উড়াইয়া দিল।

এক দিকে যেমন মাতালের দল উঠিল, অপর দিকে তেমনি এই ব্যান্ড অভ্ হোপ-এর দল উঠিল। ব্যান্ড অভ্ হোপ-এর দলের কথা ছিল: Touch not, taste not, smell not, drink not anything that intoxicates the brain, - অর্থাৎ, যাহাতে মস্তিষ্ক উত্তেজিত হয়, এমন কোনো জিনিস স্পর্শ, আস্বাদন, আঘ্রাণ বা পান করিও না। এইরূপ দুই দলে দ্বন্দ্ব চলিতে লাগিল।

কেশববাবু 'নব বৃন্দাবন'13 নামে একখানি নাটক প্রণয়ন করান। গ্রন্থখানি, সম্ভবতঃ মুদ্রিত হয় নাই; কারণ বাজারে আমরা কখনো উহা দেখি নাই। এই নব-বৃন্দাবন অভিনয়ে নরেন্দ্রনাথ কয়েক বার পাহাড়ী বাবার অংশ গ্রহণ করিয়াছিল। নরেন্দ্রনাথকে এক ব্যক্তি এক বার জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, "নরেন, পাহাড়ী বাবার ভূমিকায় কি করতে হয়?" নরেন্দ্রনাথ হাসিয়া বলিল, "চুপ করে বসে কেবল ধ্যান করতে হয়।"

যাহা হউক, নব-বৃন্দাবন অভিনয় কয়েক বৎসর বেশ একটা হুজুক আনিয়াছিল; তবে, এই অভিনয় কেশববাবুর সমাজভুক্তদিগের মধ্যে হইত, বাহিরে হইত না।

বিদ্যাসাগর মশাই14 বিধবা-বিবাহ প্রচলন করিলেন। কেশববাবু ব্রাহ্ম বিবাহ-বিধি অনুযায়ী অসবর্ণ-বিবাহ প্রচলন করিবার চেষ্টা করিলেন। কেশববাবু বালিকাদিগের জন্য বিদ্যালয়ও স্থাপন করিলেন; কারণ, এই সময় পাদরীরা দু-একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করিয়াছিল। সাধারণতঃ স্ত্রীলোকেরা ঘোমটা-ঘেরা ও টোপ-ঢাকা হইয়া বাহির হইত। সেই ভাবটা কেশববাবু দূর করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। কেশববাবু স্ত্রীলোকদিগকে সমাজে15 বসিতে দিতেন, অর্থাৎ স্ত্রীলোকদিগের বাড়ির বাহির হওয়া সমর্থন করিতেন। কেশববাবু তখনকার সমাজের নানা প্রকার সংস্কার করিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন। কিন্তু সেই সময় তাঁহার সংস্কার-প্রথা তত ফলদায়ক হয় নাই, কারণ, সমাজ তখন একেবারে পচিয়া গিয়াছিল।

পণ্ডিত গৌরগোবিন্দ রায় কেশববাবুর বিশেষ সহায় হইয়াছিলেন। তিনি ভাগবতের অতি সুন্দর ব্যাখ্যা করিতেন। সাধু অঘোরনাথ কেশববাবুর এক তাপস সহকারী ছিলেন। তিনি কয়েক বৎসর আমাদের সাত নম্বর রামতনু বসু গলির বাড়ি ভাড়া করিয়া বাস করিয়াছিলেন। এইজন্য, তাঁহাকে ঘনিষ্ঠভাবে জানিতাম; তিনি যথার্থই একজন তাপস ছিলেন। প্রতাপ মজুমদার, বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, উমেশ দত্ত, শিবনাথ শাস্ত্রী, প্রভৃতি সকলে প্রথম অবস্থায় কেশববাবুর সংস্পর্শে আসিয়া নব ভাবে উদ্দীপ্ত হইয়াছিলেন। অবশেষে, শাস্ত্রী মশাই, গোঁসাইজী, উমেশ দত্ত, নগেন চট্টোপাধ্যায়, প্রভৃতি সকলে পৃথক হইয়া 'সাধারণ-সমাজ' স্থাপন করেন; কিন্তু তাহা হইলেও, কেশববাবুর প্রতি সকলের শ্রদ্ধা-ভক্তি পূর্বের ন্যায় অটল ছিল। আমরাও সকলে তাঁহাকে বিশেষ শ্রদ্ধা-ভক্তি করিতাম।

সাধারণ-সমাজ গঠিত হইলে পর, আমরা সাধারণ-সমাজে যাইতে লাগিলাম। সেখানে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, শিবনাথ শাস্ত্রী, নগেন চট্টোপাধ্যায়, উমেশ দত্ত, প্রভৃতি কয়েক জনের বক্তৃতা শুনিতাম। এইরূপে, ক্রমে যুবকদিগের ভিতর ব্রাহ্মধর্মের ভাব জাগিয়া উঠিল। পরে যাঁহারা পরমহংস মশাই16-এর কাছে গিয়াছিলেন তাঁহাদের মধ্যে অধিকাংশ ব্যক্তিই প্রথমে সাধারণ-সমাজে যাতায়াত করিতেন।

যুবা শরৎ17 বিগ্রহপূজা বা মূর্তিপূজার বিশেষ বিরোধী ছিল। কারণ, তখন সে সাধারণ-সমাজে যাতায়াত করিত। বরানগর মঠে, এক দিন বিকালবেলা, আমার সঙ্গে তাহার এ বিষয়ে অনেক কথা হইয়াছিল।

বেলুড় মঠে, এক দিন সারদানন্দ আমায় বলিলেন, "আচ্ছা, মনে আছে তোমার, গোস্বামী মশাই করুণ স্বরে বলতেন - হে শ্রীহরি, হে শ্রীহরি, হে শ্রীহরি!" - গোস্বামী মশাই তিন বার তিন প্রকার কণ্ঠস্বর করিয়া অতি কাতর ও করুণভাবে বলিতেন, "হে শ্রীহরি, হে শ্রীহরি, হে শ্রীহরি!" সে বাণী শুনিলে হৃদয় জুড়াইত। সে কণ্ঠস্বর, সে শব্দ, সে বাণী এখনো প্রাণে লাগিয়া রহিয়াছে। আর কাহারো এমন কাতর ও করুণ কণ্ঠস্বর শুনি নাই।

তারকনাথও18 বিশেষরূপে ব্রাহ্ম-সমাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারকনাথ নিজ মনে সর্বদাই ব্রহ্ম-সঙ্গীত গাহিতে ভালবাসিত।

নরেন্দ্রনাথ ধ্রুপদ গান ভাল করিয়া শিখিলে পর, সাধারণ-সমাজে উপাসনার দিন, রাত্রে, মাঝে মাঝে, ধ্রুপদ গান গাহিত। ব্রহ্ম-সঙ্গীতেও সে অল্প বয়সে খ্যাতিলাভ করিয়াছিল। সাধারণ-সমাজের কর্তৃপক্ষের সহিত নরেন্দ্রনাথের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা ছিল। শিবনাথ শাস্ত্রী মশাই এক এক দিন সকালে আমাদের গৌরমোহন মুখার্জী ষ্ট্রীটের বাড়ির দরজায় আসিয়া আমায় ডাকিয়া বলিতেন, - তোমার দাদা, নরেনকে, এই সব কথা বলো, ওখানে যেতে বলো, ইত্যাদি। তিনি কয়েক বার আসিয়া আমাকে এইরূপ বলিয়া গিয়াছিলেন স্মরণ আছে।

এই সময়, নরেন্দ্রনাথ বিশেষ কিছু হিন্দু ধর্মগ্রন্থ না পাওয়ায়, হার্বার্ট স্পেনসার ও ষ্টুয়ার্ট মিল-এর গ্রন্থসমূহ অত্যধিক পাঠ করিতে লাগিল। নরেন্দ্রনাথ, স্পেনসার ও মিল-এর গ্রন্থ পাঠ করিয়া সকলের সহিত খুব তর্ক করিত। এমন কি, পাদরীদিগের সহিত সমানভাবে তর্ক করিত। Daredevilry - ডানপিটেমি করা ছিল শিমলার ছেলেদের বিশেষ spirit বা ধাত। তাহারা কাহাকেও ভয়-ডর করিত না, কাহারো খাতির রাখিত না, তেড়েফুঁড়ে মুখের উপর কথা বলিত।


1. স্বামী ব্রহ্মানন্দ।

2. শিমলা অঞ্চলে সম্ভ্রান্ত বসু মহাশয়গণ বাস করিতেন। বসু মহাশয়গণের আটজন একত্র নেশা করিতেন। একটি মাটির গামলাতে মদ ঢালিয়া, উহার চারিদিকে ঘেরিয়া বসিয়া, এই আটজন বন্ধু মুখে খাগড়ার নল দিয়া মদ টানিয়া পান করিতেন। মদের গামলাতে একটি গোলাপ ফুল দেওয়া থাকিত। যিনি ফুলটিকে নিজ নলের মুখে সকলের পূর্বে টানিয়া আনিতে পারিতেন, তিনিই এই পানমণ্ডলীর অধিপতি বা চক্রেশ্বর বলিয়া স্বীকৃত হইতেন।

3. শ্রীযুত রাখালচন্দ্র ঘোষ, পরবর্তী কালে, স্বামী ব্রহ্মানন্দ।

4. কর্নওয়ালিস স্কোয়ার (বর্তমান নাম - আজাদ হিন্দ্ বাগ)।

5. রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়।

6. গ্রন্থকারের জ্যেষ্ঠ সহোদর শ্রীযুত নরেন্দ্রনাথ দত্ত, পরবর্তী কালে স্বামী বিবেকানন্দ।

7. শ্রীযুত ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল। চিরঞ্জীব শর্মা ও প্রেমদাস নামেও ইনি পরিচিত।

8. ভক্তিচৈতন্যচন্দ্রিকা।

9. শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ বিরচিত শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত।

10. ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন।

11. কলিকাতার অ্যালবার্ট ইনস্টিটিউট-এ রক্ষিত ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের তৈলচিত্র।

12. শ্রীযুত মনোমোহন মিত্র, শ্রীযুত রামচন্দ্র দত্তের মাসতুতো ভাই।

13. নাটকটির প্রকৃত রচয়িতা শ্রীযুক্ত ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল।

14. পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

15. নব-বিধান-সমাজ।

16. শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দেহধারণকালে তাঁহাকে সকলে 'পরমহংস মশাই' বলিতেন।

17. শ্রীযুত শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী, উত্তরকালে স্বামী সারদানন্দ।

18. শ্রীযুত তারকনাথ ঘোষাল, উত্তরকালে স্বামী শিবানন্দ।

Thursday, June 21, 2018

দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস

দক্ষিণেশ্বরে যে, 'পরমহংস' নামে একজন লোক আছেন, তিনি যে খুব উচ্চ অবস্থার লোক, অতি সাধু ও অমায়িক - যাহাকে বলে, 'বালক-স্বভাব', এই প্রকৃতির লোক - এ কথা কেশববাবুর বক্তৃতা হইতে লোকে জানিতে পারিল। কেশববাবু বলিলেন যে, এই পরমহংসের 'ট্রান্স' (Trance) হয়; যীশুরও এইরূপ ট্রান্স হইত। ট্রান্স কি এক নূতন শব্দ আমরা তাহার কিছু মানে জানিতাম না। সাধারণ লোকের ধারণা হইল যে দক্ষিণেশ্বরে পরমহংস নামে কে-একজন লোক থাকে, তাহার মিরগি হয়, কিন্তু হাত-পা খেঁচাখেঁচি করে না, আপনা-আপনি ভাল হয়, ডাক্তার দেখাইতে হয় না। সাধারণ লোকে ট্রান্স বলিতে এইরূপ বুঝিত। আবার শুনা গেল যে, সে লোকটি রাসমণিদের1 পূজারী; কালীপূজা করিয়া থাকে। লোকটার নাম আবার 'পরমহংস', - এ আবার কি কথা! লোকেরা অমনি হাসি ও ব্যঙ্গচ্ছলে পরমহংস-কে 'গ্রেট গূস' (Great goose) বলিতে লাগিল।

পরমহংস মশাই-এর প্রতি তখনকার লোকের প্রথমে এইরূপ কিঞ্চিৎ অবজ্ঞা বা অশ্রদ্ধার ভাব ছিল। আমরা তখন তাঁহাকে দেখি নাই, আর দেখিতে যাইবার ইচ্ছাও ছিল না। - কোথায়, কে একজন লোক আছে, তার মিরগি ব্যামো হয়, কি আর দেখবো! কেশববাবু বলিয়াছেন, লোকটি ভাল, এইজন্য তাহার বিষয় কিঞ্চিৎ জানিতে আগ্রহ ছিল মাত্র। দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসের বিষয় এর বেশী কিছু আমাদের জানা ছিল না, এবং অন্য লোকেরাও জানিত না।

বোধ হয়, ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে রামদাদার বাড়িতে কলেরা হয়। তাহাতে, রামদাদার প্রথম মেয়েটি এবং দুইটি ভগিনী, সাত দিনের ভিতর মারা যায়। রামদাদা সেই সময় বড়ই অধীর হইয়া পড়িয়াছিলেন, এবং কোনো জায়গায় শান্তি পাইলেন না। অবশেষে, তিনি দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসের নিকট যাইলেন। কেশববাবুর নিকট হইতে শুনিয়া পূর্বে তিনি দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসের কাছে যাতায়াত করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু শ্রদ্ধা, ভক্তি করিয়া তাঁহার নিকট যাওয়া, এবং তাঁহার সহিত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে আসা, এই হইল প্রথম। পরমহংস মশাই-এর সহিত রামদাদার কি কথাবার্তা হইয়াছিল, সে সব বিষয় আমার কিছু জানা নাই। তবে রামদাদা, পরমহংস মশাই-এর কাছে যাইয়া, অনেকটা শান্তি পাইলেন এবং স্থির-ধীর হইয়া কার্য করিতে লাগিলেন। মোট কথা, এই হইল আমাদের শিমলার লোকের পরমহংস মশাই-এর সহিত প্রথম ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ।

রামদাদা ডাক্তারি করিতেন। এইজন্য, তাঁহাকে লোকে 'রামডাক্তার' বলিয়া ডাকিত। রামদাদা কিছু দিন দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত করিবার পর, শিমলায় খবর রটিল যে রামডাক্তারের এক গুরু হইয়াছে, সে কৈবর্তদিগের পূজারী, দক্ষিণেশ্বরে থাকে। ইহাতে নানাপ্রকার কথাবার্তা উঠিল, কারণ, রামদাদারা হইলেন বৈষ্ণববংশীয়। রামদাদার পিতামহ, কুঞ্জবিহারী দত্ত গোঁসাই ছিলেন, এবং তাঁহার বহু শিষ্য ছিল। রামদাদা নিজের কুলগুরুর কাছে দীক্ষা না লইয়া, এক অজানা ব্যক্তির কাছে দীক্ষা লইয়াছেন, সে ব্যক্তি আবার কালীর উপাসক, শাক্ত! এইজন্য, অনেকেই তাঁহার উপর অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। যাহা হউক, রামদাদা নিজের কুলগুরুর নিকট মন্ত্র না লইয়া পরমহংস মশাইকে গুরু বলিয়া স্বীকার করিলেন।

রামদাদা দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত করায়, প্রথমে কিছু দিন সকলেই তাঁহাকে বিদ্রূপ করিতে লাগিল: এ আবার কি ঢঙ হ'ল, পরমহংসই বা কি? রামদাদা কিন্তু রবিবারে অবসর পাইলেই দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত করিতে লাগিলেন। তিনি তাঁহার সমবয়সী বন্ধু ও পাড়ার লোক, সুরেশ মিত্তিরকে2 এই সকল কথা বলেন।

সুরেশ মিত্তির সওদাগরী অফিসের একজন বড় কর্মচারী ছিলেন। সুরেশ মিত্তিরদের বাড়ি আমাদের তিন নম্বর গৌরমোহন মুখার্জী ষ্ট্রীটের বাড়ি-সংলগ্ন ছিল। আমাদের বাড়ির পিছনে পুকুরের পাড় দিয়া তাঁহাদের বাড়ির ভিতর যাতায়াত করা যাইত তবে, তাঁহাদের বাড়ির সদর দরজা ভিন্ন রাস্তায় ছিল। এখন সে বাড়ি ভাঙিয়া রাস্তা হইয়াছে। সুরেশ মিত্তির শাক্ত ছিলেন, প্রথম অবস্থায় তিনি অতি দুর্ধর্ষ লোক ছিলেন। কেশববাবু যখন বিডন গার্ডেন-এ বক্তৃতা দিয়াছিলেন ও খোল বাজাইয়া নামকীর্তন করিয়াছিলেন, তখন সুরেশ মিত্তির ছুরি দিয়া খোলের চামড়া কাটিয়া দিয়াছিলেন।

রামদাদা সুরেশ মিত্তিরকে পরমহংস মশাই-এর কথা বলিলে, তিনি উপহাস করিয়া বলিলেন, "ওহে রাম, তোমার গুরু, পরমহংস যদি আমার কথার উত্তর দিতে পারে, তবে ভাল, নইলে তার কান মলে দিয়ে আসবো।" সুরেশ মিত্তির কান মলিয়া দিবেন, এই শর্তে দক্ষিণেশ্বরে গিয়াছিলেন; কিন্তু পরমহংস মশাই-এর সহিত খানিকক্ষণ কথাবার্তা কহিবার পর তাঁহার প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হইয়াছিলেন, এবং তাহার পর হইতে তিনি পরমহংস মশাই-এর অন্তরঙ্গ হইয়াছিলেন।

কৈলাস ডাক্তারও3 আমাকে এক বার বলিয়াছিলেন যে, রামদাদা যখন তাঁহাকে এক বার কাশীপুরের বাগানে যাইয়া পরমহংস মশাইকে দেখিবার জন্য অনুরোধ করিয়াছিলেন, তখন তিনি বলিয়াছিলেন, "রাম তোমার পরমহংস যদি ভাল লোক হয় তো ভাল, নইলে তার কান মলে দেবো।" এই কড়ারে, কৈলাসডাক্তার, রামদাদার সহিত কাশীপুরের বাগানে গিয়া, নীচে পুকুরের ধারে চাতালে বসিয়া থাকেন। তিনি বলিয়াছিলেন, "আরে প্রথমে গিয়ে দেখলুম যে নরেনটা বি.এ. পাশ করে একেবারে বখে গেছে, নীচেকার হলঘরে কতকগুলো ছোঁড়া নিয়ে এলোমেলো ভাবে বসে আছে, আর, রামের বাড়ির সেই চাকর ছোঁড়া লাটু4, সেটাও কাছে বসে আছে, আরে ছ্যা!" - তিনি বলিতে লাগিলেন, "পরমহংস মশাই-এর শরীর অসুস্থ ছিল, সেইজন্য লোক মারফৎ বলে পাঠালেন, যে, যে বাবুটি আমার কান মলে দেবেন বলেছেন, তাঁকে ওপরে নিয়ে এস। যে লোকটি ডাকতে এসেছিল, সে তো অবাক্ হয়ে খুঁজতে লাগলো, আর, কিছু ইতস্ততঃ করে ঐ কথাগুলি বলতে লাগলো।"

এই শুনিয়া, অপ্রতিভ হইয়া, কৈলাস ডাক্তার অবশেষে সসম্ভ্রমে উপরে যাইবার উদ্যোগ করিলেন এবং ভাবিতে লাগিলেন, "শিমলাতে ঘরের ভেতর বসে রামের সঙ্গে পরমহংসের বিষয় যে কথা হয়েছিল, কাশীপুরের বাগানে সে সংবাদ এখনি কি করে এল!" তিনি আশ্চর্যান্বিত হইয়া উপরে যাইয়া পরমহংস মশাই-এর পায়ের কাছে প্রণাম করিলেন। তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, অজান্তে কি ভুল কাজই না করিয়াছিলেন। সেই অবধি কৈলাস ডাক্তার পরমহংস মশাইকে গুরু বলিয়া মানিতেন এবং তাঁহার প্রতিকৃতি প্রণাম না করিয়া বাড়ি হইতে বাহির হইতেন না।

নরেন্দ্রনাথ ছিল শিমলার এক দুষ্টু ছেলে। বয়স অল্প হইলেও, সে খুব ধীশক্তিসম্পন্ন ছিল। সাধারণ-সমাজ, কেশববাবুর সমাজ, প্রভৃতি অনেক জায়গায় সে যাতায়াত করিত। পাড়ায় তাহার একটা বেশ নাম ছিল। সে ছিল পাড়ার ছেলেদের চাঁই বা সর্দার। পাড়ার সব ছেলে তার অনুগত ছিল। নরেন্দ্রনাথের পাড়ার ডাক-নাম ছিল 'বিলে'। কাশীর ৺বীরেশ্বরের পূজা করিয়া তাহার জন্ম হওয়ায়, তাহার নাম রাখা হইয়াছিল 'বীরেশ্বর' - ক্রমে, সংক্ষেপে তাহা 'বিলে' হইয়া যাইল। রামদাদা এক দিন বলিলেন, "বিলে, তুই তো এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াস, দক্ষিণেশ্বরে এক পরমহংস আছেন, দেখতে যাবি? চল্।" নরেন্দ্রনাথ অমনি বলিল, "সেটা তো মুক্খু, কী সে পেয়েছে, যে তার কাছে তা শুনতে যাব? আমি স্পেনসার, মিল, হ্যামিলটন, জন লক, প্রভৃতির এত দর্শনশাস্ত্র পড়লুম আমি কিছু বুঝি না, আর, একটা আকাট মুক্খু, কালীর পূজারী, কৈবর্তদের বামুন - সেইটার কাছে শিখতে যাব? সেটা জানে কি? কী জেনেছে, যে আমাকে শেখাতে পারে?" রামদাদা তথাপি নরেন্দ্রনাথকে পরমহংস মশাই-এর কাছে যাইবার জন্য অনেক অনুনয় করিয়া বলিতে লাগিলেন। অবশেষে নরেন্দ্রনাথ বলিল, "যদি সে রসগোল্লা খাওয়াতে পারে তো ভাল, নইলে কান মলে দেবো, আকাট মুক্খুটাকে সিধে করে দেবো।" - তখনকার দিনে 'কান মলে দেবো' বলাটাই যেন অবজ্ঞা প্রকাশ করিয়া কথা বলিবার ধারা ছিল।

নরেন্দ্রনাথ পরে এক দিন দক্ষিণেশ্বরে পরমহংস মশাই-এর কাছে গিয়াছিল। নরেন্দ্রনাথকে দেখিয়া পরমহংস মশাই জোড়হাত করিয়া অনেক স্তবস্তুতি করিয়াছিলেন। আর এক দিন নাকি, পরমহংস মশাই নরেন্দ্রনাথকে স্পর্শ করিতেই সে অর্ধজ্ঞানশূন্য হইয়া যাইয়া বলিয়াছিল, "তুমি আমায় কি করলে, আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? আমার যে বাপ-মা আছে! আমি যে উকিল হবো!" - ইহা আমার শুনা-কথা, আমি সে সময়ে উপস্থিত ছিলাম না, এইজন্য ঠিকভাবে বলিতে পারিতেছি না। আমি এ বিষয়ে স্বামী সারদানন্দের কাছে শুনিয়াছিলাম; রামদাদার কাছেও কিছু কিছু শুনিয়াছিলাম।

পূর্বে, মাত্র রামদাদা দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত করিতেন, কিন্তু এখন পাড়ার সুরেশ মিত্তির ও নরেন্দ্রনাথও দক্ষিণেশ্বরে যাতায়াত করিতে লাগিলেন। রামদাদা এখন একটু জোর পাইলেন যে, পাড়ার কেহ আর বিদ্রূপ ও আপত্তি করিবে না। শিমলার সুরেশ মিত্তির ও নরেন্দ্রনাথ পরমহংস মশাই-এর অনুরক্ত হইলে, শিমলার লোকের মনের ভাব অনেক বদলাইল; কারণ, এই দুই ব্যক্তিই ছিলেন শিমলার যুবকদের সর্দার। এইজন্য, রামদাদা এই ভাবিয়া মহা আনন্দিত হইলেন যে, তাঁহার কার্য সফল হইয়াছে।


1. রাণী রাসমণি।

2. শ্রীযুত সুরেন্দ্রনাথ মিত্র ইঁহার নাম, পাড়ার লোকে 'সুরেশ মিত্তির' বলিয়া ডাকিতেন। শুনা যায়, শ্রীরামকৃষ্ণদেবও ইঁহাকে আদর করিয়া 'সুরেশ' বলিয়া ডাকিতেন।

3. ডাক্তার স্যার কৈলাসচন্দ্র বসু।

4. শ্রীযুক্ত রামচন্দ্র দত্তের যুবক-ভৃত্য; উত্তরকালে স্বামী অদ্ভুতানন্দ।

Saturday, June 16, 2018

রামদাদার বাড়িতে

রামদাদাদের পূর্বকার বাড়ি ছিল কলিকাতার পূর্ব প্রান্তে, নারিকেলডাঙ্গায়। এই বাড়ি নষ্ট হইয়া যায়। রামদাদা শিমলায় বাড়ি তৈয়ার করিয়াছিলেন। বাড়ির ঠিকানা ছিল - এগারো নম্বর মধু রায় লেন। এই লেন বা গলিটি ছোট; পূর্ব-পশ্চিম বরাবর। এই বাড়িতেই পরমহংস মশাই সর্বদা আসিতেন। বাড়িটি গলির দক্ষিণ দিকে। বাড়িটির সদর দরজা ছিল উত্তরমুখো। দক্ষিণমুখো হইয়া সদর দরজায় ঢুকিতে, ডান দিক হইতে পশ্চিম দিকের দেওয়াল পর্যন্ত, বাহিরে একটি সরু ও লম্বা রক ছিল। দরজায় ঢুকিয়া সম্মুখে, একটা পথ বা দালান বা একটা বড় ঘরের মাপের মতো জায়গা; এবং ডান ধারে, অর্থাৎ, পশ্চিম দিকে, তিনটি দরজাওয়ালা একটি বৈঠকখানা। এই ঘরটির উত্তর দিকে, অর্থাৎ রাস্তার দিকে, লোহার গরাদেওয়ালা দুইটি জানালা; এবং দক্ষিণ দিকে, গরাদেওয়ালা অনুরূপ দুইটি জানালা ছিল। পশ্চিম দিকের দেওয়ালের মাঝখানে সার্শিদেওয়া তাক; এবং তাহার দুই পাশে দুইটি খালি ফোকর, অর্থাৎ তাহাতে তাক ছিল না। সদর দরজার সম্মুখের পথটি বা দালানটি দিয়া দক্ষিণ দিকে বা ভিতর দিকে যাইলে, ছোট একটি দালান। দালানটি হইল পূর্ব-পশ্চিমমুখো বা বরাবর। দালানের দক্ষিণ দিকে, ছোট একটুখানি উঠান। উঠানটির বাঁ-দিকে বা পূর্ব দিকে, দুইটি থামওয়ালা একটুখানি দালান; এবং ঠিক দক্ষিণ দিকে, একটি লম্বা ঘর। উঠানের ডান দিকে বা পশ্চিম দিকের দেওয়ালের কাছে, উপরে উঠিবার সিঁড়ি। সিঁড়িটিতে দক্ষিণমুখো হইয়া উঠিতে হইত। সিঁড়ি দিয়া উঠিতে বাঁ-দিকে বা মাঝের চাতালের দক্ষিণ দিকে একটি কুঠরি বা ছোট ঘর। এই ঘরটিতে শিবানন্দ স্বামী কিছুকাল তপস্যা করিয়াছিলেন। তাহার পর, সিঁড়িটি ধরিয়া ঘুরিয়া গিয়া দোতলায় উত্তরমুখো হইয়া উঠিলে, প্রথমে, সম্মুখে একটি কল-ঘর; এবং পূর্ব দিকে মুখ করিলে, একটি লম্বা দালান। দালানটির উত্তর দিকে, নীচুকার বৈঠকখানা ও সদর দরজার দালানের রুজু, দুইটি ঘর। বাড়ির উপরে, দোতালায়, পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে, আরো দুইটি ঘর ছিল; এবং নীচুকার পূর্ব দিকের বর্ণিত ছোট দালানের উপরেও আর একটি ঘর ছিল। দোতালার সিঁড়িটি আবার ঘুরিয়া গিয়া তেতলার ছাদে উঠিয়াছে। এই হইল রামদাদার বাড়ির মোটামুটি বর্ণনা। ইহা হইল ১৮৮২ বা ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দের কথা।

বোধ হয়, এই বৎসরেরই গরমিকালে, বৈকালবেলায়, পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসিলেন। দিনটি শনিবার কি রবিবার হইবে। আমি সন্ধ্যার সময় যাইলাম। যাইয়া বৈঠকখানার তৃতীয় দরজাটির সম্মুখে, অর্থাৎ দক্ষিণ দেওয়ালের নিকট যে দরজাটি তাহার সম্মুখে বসিলাম। ঘরটিতে প্রায় পনেরো হইতে বিশ জন লোক বসিয়াছিল, এবং বাহিরে দালানটিতেও প্রায় ততগুলি লোক ছিল। বোধ হয় মোট লোকসংখ্যা চল্লিশ হইতে পঞ্চাশ হইবে। পূর্বেই বলিয়াছি, তখনকার দিনে প্রণাম করিবার প্রথা উঠিয়া গিয়াছিল। এইজন্য তখনকার রীতি অনুযায়ী প্রণাম না করিয়া দরজার নিকটে চুপ করিয়া বসিলাম; কেহ প্রণাম করিত না, আমিও করিলাম না। দাদা পূর্বেই আসিয়াছিল; বৈঠকখানাতে তিনখানি তক্তাপোশ পাতা ছিল, তাহার উপর শতরঞ্জি ও জাজিম বিছানো এবং কয়েকটি তাকিয়া ছিল। তামাকের কোন বন্দোবস্ত ছিল না; কারণ রামদাদার হাঁপানি ব্যামো থাকায় তামাকের ধোঁয়াতে হাঁপানি বাড়িত। ঘরটির কড়ি-কাঠ হইতে, কাঁচের বাটির মতো দেখিতে, দুইটি গ্যাসের বাতি জ্বলিতেছে। পরমহংস মশাই পশ্চিম দিকের আলমারির বা সার্শি-দেওয়া তাকের কাছে বসিয়া আছেন, পিছনে একটি তাকিয়া। দেবেন মজুমদার মশাই1 তৃতীয় দরজার মাঝখানটিতে বসিয়াছেন; তাঁহার পরনের কাপড়খানি বেশ ফরসা ও কোঁচানো; হাঁটুর উপর কাপড়খানি রাখিয়াছেন; আর কোঁচানো উড়ুনিখানিও দু-ভাঁজ করিয়া দুই হাঁটুর উপর রাখিয়াছেন; গায়ে পিরান নাই, গলায় পইতা। দেবেন মজুমদার মশাই বরাবর আমাদের বাড়িতে আসিতেন, এইজন্য বহুকাল হইতে তিনি আমাদের পরিচিত ছিলেন। পাড়ার বৃদ্ধ কালীপদ সরকার মশাই-ও ঘরে বসিয়াছিলেন। বাকি আর সকলে অন্য জায়গার লোক ছিলেন, তাঁহাদের চিনিতাম না। সুরেশ মিত্তির প্রণাম করিয়া অস্থির হইয়া পায়চারি করিতেছেন, যেন ভাবে ও আনন্দে স্থির হইয়া বসিবার সামর্থ্যও নাই। রামদাদা এদিক-সেদিক করিতেছেন। গরমিকাল; ঘরটির ভিতরে গরম ছিল, এইজন্য দাদা রাস্তার ধারের রকটিতে বসিল। রাখাল লাজুক ছিল, সে ঘরের ভিতর না ঢুকিয়া এদিক-ওদিক কোথায় রহিল। রামদাদার মাসতুতো ভাই, মনোমোহনদাদা (রাখালের নিজ শ্যালক) ঘরের ভিতর চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন।

আমার প্রথম এইরূপ মনে হইল - দক্ষিণেশ্বর থেকে এই যে লোকটি এসেছে, একেই কি বলে 'পরমহংস'? দেখিলাম লোকটির চেহারাতে কোন বৈশিষ্ট্য নাই, চেহারা সাধারণ পাড়াগেঁয়ে লোকের মতো; বর্ণ খুব কালো নয়, তবে, কলিকাতার সাধারণ লোকের বর্ণ হইতে কিছু মলিন। গালে একটু একটু দাড়ি আছে, কপচানো দাড়ি। চোখ দুটি ছোট - যাহাকে বলে, 'হাতি চোখ'। চোখের পাতা অনবরত মিটমিট করিতেছে, যেন অধিক পরিমাণে চোখ নড়িতেছে। ঠোঁট দুটি পাতলা নয়। নীচুকার ঠোঁট একটু পুরু। ঠোঁট দুটির মধ্য হইতে, উপরকার দাঁতের সারির মাঝের কয়েকটি দাঁত একটু বাহির হইয়া রহিয়াছে। গায়ে জামা ছিল; তাহার আস্তিনটা কনুই ও কব্জির মাঝ বরাবর আসিয়াছে। খানিকক্ষণ পরে, জামা খুলিয়া পাশে রাখিয়া দিল এবং কোঁচার কাপড়টি লম্বা করিয়া বাঁ কাঁধে দিল। ঘরটি বেশ গরম হইয়াছিল। একজন লোক বড় এড়ানী পাখা অর্থাৎ বড় পাখা লইয়া পিছন দিক হইতে বাতাস করিতে লাগিল। কথাবার্তার ভাষা কলিকাতার শিক্ষিত সমাজের ভাষার মতো নয়, অতি গ্রাম্য ভাষা, এমন কি, কলিকাতা শহরের রুচিবিগর্হিত। কথাগুলি একটু তোতলার মতো। রাঢ়দেশীয় লোকের মতো উচ্চারণ; ন এর জায়গায় ল উচ্চারণ করিতেছে, যেমন, 'লরেনকে বললুম', ইত্যাদি। সম্মুখে একটি রঙিন বটুয়া রহিয়াছে, তাহার মধ্যে কি মশলা আছে; মাঝে মাঝে একটু মশলা লইয়া মুখে দিতেছে।

আমাদের বয়স তখন অল্প এবং আমরা শিক্ষিত সমাজে পরিবর্ধিত; এইজন্য, ভাষা ও উচ্চারণ শুনিয়া পরমহংস মশাই-এর প্রতি মনে একটি অবজ্ঞার ভাব আসিল - এই লোকটাকে রামদাদা কেন এত সম্মান ও শ্রদ্ধা-ভক্তি করেন? চুপ করিয়া বসিয়া সব দেখিতে লাগিলাম। মনে মনে আবার ভাবিতে লাগিলাম - কেন রামদাদা এই লোকটাকে এত সম্মান করেন; দুর্ধর্ষ সুরেশ মিত্তির এবং বুদ্ধিমান নরেন্দ্রনাথই বা কেন কয়েক বার এর কাছে গেছেন? লোকটার কি ব্যাপার? - দেখিলাম, ঘরে অনেকে বসিয়া আছেন, কিন্তু দুই-একটি বৃদ্ধ একটি বা দুইটি প্রশ্ন করিলেন মাত্র; আর কেহ কিছু কথা কহিলেন না। লোকটি আপনি কথা কহিতেছে ও মাঝে মাঝে শ্যামা-বিষয়ক গান গাহিতেছে; কখনো বা বৈষ্ণবদিগের গানও গাহিতেছে। সকল লোক নীরব হইয়া রহিয়াছে। আর একটি বিষয় দেখিলাম যে সাধারণতঃ, কথকতা শুনিতে যাইলে মনে অন্য এক প্রকার ভাবের উদয় হয় - একটু হাসি-কৌতুকের ভাব থাকে; সাধারণ-সমাজে যাইলে মনটা উসখুস করে এবং একটু গান শুনিবার ইচ্ছা থাকে বা কখন চলিয়া আসিব - এই ভাবনা হয়; ঠিক মন বসে না, যেন আধা-বৈঠকখানা ও আধা-ঠাকুরবাড়ি ভাব। কিন্তু এখানে প্রথম দেখিলাম যে, সেরূপ ভাব আসিল না; অন্য প্রকার একটি ভাব আসিতে লাগিল, ত্রাসও নয়, উদ্বেগও নয়; কিন্তু ইচ্ছা হইল চুপ করিয়া বসিয়া থাকি। কেহই কোনো কথা কহিতেছে না; লোকটি যখন নিজে ইচ্ছা করিয়া কথা কহিতেছে তখনই কথা হইতেছে মাত্র। গ্যাসের বাতি দুটির সোঁ-সোঁ করিয়া আওয়াজ হইতেছে। ঘর একেবারে নিস্তব্ধ, যেন ঘরে একেবারে মানুষ নাই।

খুব স্থির হইয়া দেখিতে লাগিলাম। দেখিলাম লোকটি পাড়াগেঁয়ে অশিক্ষিত; মাঝে মাঝে অসভ্য ভাষায় কথা কহিতেছে। কিন্তু লোকটি পাগলও নয়, যে নিতান্ত এলোমেলো ভাব। আফিমখোরের ভাবও নয় যে নিঝুম হইয়া আছে। পাগল হইলে এলোমেলো ভাব হয়, বড় হাত-পা নাড়ে, মাথা নাড়ে; এ লোক সেরূপ নয়। আবার যে বালকের ভাব, সে রকমও তো নয়; কারণ ছোট ছেলেদের ভিতর নিরবচ্ছিন্নতার, অর্থাৎ Continuance-এর ভাবটি থাকে না। আবার যে সাধারণ লোক, তাহাও তো দেখিতেছি না। তীক্ষ্ণবুদ্ধি-সম্পন্ন যে লোক - নানা বিষয়ে বেশ পরামর্শ দিতে পারে, তাহাও তো দেখিতেছি না। তর্ক, যুক্তি ও নানা রকম দার্শনিক মত, যাহা আমরা সর্বদা শুনিতাম, এ ব্যক্তি তো সেরকম কিছু কথা বলিতেছে না। দেখিলাম লোকটি হড়বড় করিয়াও কথা বলিতেছে না বা যাহাকে বলে 'প্রগল্ভ', তাহাও তো নয়! কলিকাতায় যেমন বক্তৃতা শুনিতাম, বক্তা অনর্গল কথা বলিয়া যাইতেছে, এ লোকটি তো তেমনও কিছু বলিতেছে না। পণ্ডিতগিরি ফলানো বা গুরুগিরি করাও তো নাই। - লোকটি যেন তাহার মনটিকে উচ্চ স্তর হইতে নামাইয়া আনিয়া কথা কহিতেছে; আর না হইলে এক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিয়াছে। কেহই তাহার সহিত তর্ক-যুক্তি করিতেছে না। কেহই প্রশ্ন করিতেছে না, বা করিবারও কাহারো ইচ্ছা নাই। লোকটি যা বলিতেছে, তাহাই সকলে স্থির হইয়া শুনিতেছে। সকলেই তাহার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে চাহিয়া আছে যে, সে কখন কি বলিবে।

আর একটি বিষয় দেখিলাম যে, শ্যামা-বিষয়ক বা বৈষ্ণবদিগের গান তো চলিত গান, এ সকল বহুবার শুনিয়াছি, নূতনত্ব কিছুই নাই; কিন্তু এই লোকটি যখন, মাঝে মাঝে, সেই সকল চলিত গানই গাহিতেছে, তখন মনে অন্য এক প্রকার ভাব আসিতেছে, সে যেন অন্য এক ভাবে গানটিকে দেখাইতেছে। মাঝে মাঝে, সে যেন স্থির হইয়া যাইতেছে; আবার, যেন গলা শুকাইয়া যাইতেছে বলিয়া, বটুয়া হইতে একটু একটু মশলা লইয়া মুখে দিতেছে। কথাবার্তা যাহা বলিতেছে, তাহা মনে রাখা যাইতেছে না। কিন্তু কথাগুলি যে ঠিক, সত্য - এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই হইতেছে না। তর্ক করিবার ইচ্ছা হইতেছে না, কথাগুলি যে নিশ্চিত ও নির্দ্বন্দ্ব - এই ভাবটি যেন ভিতরে আসিতেছে। শব্দ ও ভাব এত তাড়াতাড়ি আসিতেছে যে, কথাগুলি মনে রাখিবার সুবিধা হইতেছে না এবং সময়ও পাওয়া যাইতেছে না। কথাগুলি শুনিবার বিষয়; কিন্তু তাহার অর্থ জানি না, তাৎপর্যও কিছু বুঝি না।

সকলেই যেন এক প্রকার ভাবে অভিভূত হইয়া পড়িল। বেশ একটু ঘোরপানা আচ্ছন্ন ভাব আসিতে লাগিল। অন্য কোনো বিষয়: ক্ষুধা পাইয়াছে; তৃষ্ণা পাইয়াছে, জলপান করিব; বা অধিক রাত্রি হইয়াছে, বাড়ি ফিরিয়া যাইব - এ সকল কোনো চিন্তাই মনে আসিতেছিল না। সকলে স্থির ও নিঝুম হইয়া বসিয়া রহিল। খানিকক্ষণ পরে দেখি যে, লোকটি কথা কহিতে কহিতে স্থির হইয়া গেল। ডান হাতের মাঝের আঙুল তিনটি বাঁকিয়া গেল। হাত দুটি সিধা ও শক্ত হইয়া গেল। মিরগি হওয়া আমরা ঢের দেখিয়াছি, কিন্তু এ তো তা নয়। আমরা সকলে তাহার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলাম। মিরগি হইলে, মুখে চোখে জল দিতে হয়, বাতাস করিতে হয়; একে তো সেরূপ করিতে হইতেছে না। এই নূতন ব্যাপার দেখিয়া আমরা কিছুই বুঝিতে পারিতেছিলাম না। এই মাত্র বিশেষভাবে বুঝিলাম যে, মনটাকে উপর হইতে নামাইয়া আনিয়া লোকটি কথা কহিতেছে, এবং আমাদের মনকে যেন আঠা দিয়া জুড়িয়া উপর দিকে লইয়া যাইতেছে। দেখিলাম যে, লোকটির প্রতি একটা টান আসিল। এ টান - ভালবাসা বা স্নেহ-মমতা নয়। কারণ, এগুলি নিম্ন স্তরের লোকের প্রতি হয়। শ্রদ্ধা-ভক্তিও নয়; তাহা হইলে উচ্চ-নীচ জ্ঞান থাকে ও ভয় থাকে। এ টান ভিতরের; লোকটির কাছে থাকিতেই ভাল লাগিতেছে।

আমাদের বাড়ি তখন বড়মানুষের বাড়ি, পাড়ার সকল লোকের বসিবার জায়গা। এইজন্য, আমরা বহু প্রকার লোক দেখিতে পাইতাম; বহু প্রকার লোকের সঙ্গে আমরা মিশিতাম। কিন্তু দেখিলাম যে, এই লোকটিকে কোনো বিশেষ থাকের বা শ্রেণীর ভিতর ফেলা যাইতেছে না। সকল শ্রেণীর হইতে পৃথক, অথচ যেন কিছু সম্পর্ক আছে। আমাদের তখন বয়স অল্প; এইজন্য, প্রথমটায় সব গোল হইয়া গিয়াছিল।

আমরা যখন ছাদে খাইতে যাইলাম, তখন দেখিলাম যে ব্রাহ্মণ-কায়স্থ সকলেই একসঙ্গে বসিয়া খাইতেছে; অন্য পাড়ার দু-পাঁচ জন লোকও তাহার ভিতর আছেন। অবশ্য, নিরামিষ রান্না - লুচি-তরকারি ইত্যাদি হইয়াছিল। তখনকার দিনে সকল জাতের সঙ্গে একত্র খাওয়ার প্রথা ছিল না। তখন বাড়িতে যাইয়া নিমন্ত্রণ করিয়া আসিবার প্রথা ছিল; কিন্তু দেখিলাম যে, এখানে সকলে অ-নিমন্ত্রিতভাবে খাইতেছেন। 'ইয়ার' লইয়া হাসি-তামাসা করিয়া যে খাওয়া, তাহা নয়। যজ্ঞিবাড়ির যে খাওয়া, তাহাও নয়। যজ্ঞিবাড়িতে খাইলে অনেক সময় একটা বেগারঠেলার খাওয়ার ভাব থাকে। যজ্ঞিবাড়ির বেগারঠেলার খাওয়াতে ও এ খাওয়াতে অনেক তফাৎ বোধ হইল। এখানে যেন সকলেই শ্রদ্ধা-ভক্তি করিয়া খাইতেছেন, কেহই অবজ্ঞার ভাবে খাইতেছেন না। যে সকল লোক একসঙ্গে খাইতেছিলেন, তাঁহাদের পরস্পরের ভিতর একটি টান দেখা গেল; যেন নিজের লোক বলিয়া একটি ভাব আসিল।

আহারাদি করিয়া আমরা সকলে নীচে নামিয়া আসিলাম। পরমহংস মশাই, রাত্রি আন্দাজ এগারোটার সময়, গাড়ি করিয়া চলিয়া গেলেন। আমরাও চলিয়া আসিলাম। দেখিলাম, প্রায় তিন দিন কি রকম একটি ঘোর ঘোর নেশা রহিল। যেমন সকলে সাধারণ কাজ করিয়া থাকে, তাহাও করিতেছি, কিন্তু মনটা যেন পৃথক হইয়া রহিয়াছে, সব জিনিসের সহিত মাখামাখি হইয়া থাকিতেছে না, মনটা যেন সব জিনিস হইতে তফাৎ থাকিতেছে, বেশি মেশামেশি করিতে চাহিতেছে না। পরমহংস মশাই চলিয়া গেলেন, কিন্তু তাঁহার প্রতি ভিতর হইতে একটি টান রহিয়া গেল; সেটা যে অন্য প্রকারের জিনিস, তাহা আমরা বেশ বুঝিতে পারিলাম। এই হইল প্রথম দিনকার দর্শনের কথা।


1. শ্রীযুত দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার।

Tuesday, June 12, 2018

লোকের মনোভাব পরিবর্তন

পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে এইরূপ বারকতক আসা-যাওয়া করাতে, পাড়ার লোকের তাঁহার প্রতি আর বিদ্বেষভাব কিছু রহিল না, কেহ উপহাসও করিত না। সকলেই তাঁহাকে একটু শ্রদ্ধার চোখে দেখিতে লাগিল। এখন হইতে জনসমাগমও কিছু অধিক হইতে লাগিল। তবে একটি বিশেষ লক্ষ্য করিবার বিষয় ছিল এই যে, এই ব্যাপারে কাহাকেও গিয়া নিমন্ত্রণ করা হইত না। সামাজিক কোনো কার্যে যেমন বাড়িতে গিয়া নিমন্ত্রণ করিতে হইত, তেমন করিতে হইত না। কেবল এই কথা বলিলেই হইত যে, অমুক দিন পরমহংস মশাই রামডাক্তারের বাড়িতে আসিবেন; তাহা হইলেই যাঁহারা পরমহংস মশাইকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করিতেন, তাঁহারা সকলেই সন্ধ্যার সময় সেখানে যাইতেন। ক্রমে, চল্লিশ-পঞ্চাশ জন লোক হইতে এক শত বা দেড় শত লোক হইতে লাগিল।

এই সময় পাড়ার মহেন্দ্র গোসাঁই পরমহংস মশাই-এর সহিত এক দিন দেখা করিতে আসিলেন। তিনি পাড়ার প্রধান লোক ও গোস্বামী; এইজন্য, বৈঠকখানার দক্ষিণ দিকের জানালা দুইটির মাঝখানে, পরমহংস মশাই-এর ডান ধারে, একখানি আসন পাতিয়া তাঁহার বসিবার স্থান করিয়া দেওয়া হইল। পাড়ার মহেন্দ্র গোসাঁই আসিলেন, কিন্তু, কোনো ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ আসিতেন না; ইহা আমি বিশেষ করিয়া লক্ষ্য করিয়াছিলাম। পরমহংস মশাই ছিলেন মাড়েদের ঠাকুরবাড়ির পূজারী - মাহিষ্যদের পূজারী, তাহার উপর গলায় পইতা ছিল না; এইজন্য ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণেরা তাঁহাকে প্রণাম করিতে রাজী ছিলেন না, আর এই কারণেই, ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণেরা তাঁহার কাছে আসিতেন না। দক্ষিণেশ্বর ব্রাহ্মণপ্রধান গ্রাম। সেখানকার ব্রাহ্মণেরাও পরমহংস মশাইকে সেরূপ শ্রদ্ধার চোখে দেখিতেন না। কেবল যোগেন চৌধুরী1 একাই পরমহংস মশাই-এর নিকট আসিতেন। তখনকার দিনে জাত লইয়া এক ফেসাদ ছিল।


1. শ্রীযুত যোগীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী, উত্তরকালে স্বামী যোগানন্দ।

Monday, June 11, 2018

বৈঠকখানায় বসিবার ব্যবস্থা

প্রথমে পরমহংস মশাই সাধারণ লোকের মতো তক্তাপোশের উপর জাজিমে বসিতেন; কিন্তু তিনি কয়েক বার আসিবার পর তাঁহার বসিবার জন্য একখানি বিলাতী গালিচা হইল একটি তাকিয়াও হইল। এই গালিচাখানিতে শুধু তিনিই বসিতেন, অপর কেহ বসিত না; তাকিয়াটিও অপর কেহ ব্যবহার করিত না। তিনি আসিয়া চলিয়া যাইলে এগুলি আলাদা করিয়া তুলিয়া রাখা হইত। একটি কাঁচের গেলাসও হইল; সেইটিতে জল দিয়া তাঁহার ডান হাতের কাছে বটুয়ার নিকট রাখা হইত। গরমিকাল এইজন্য পিছন হইতে একখানি এড়ানী পাখা দিয়া পরমহংস মশাইকে বাতাস করা হইত। ঘরের ভিতর যে যাহার নিজ নিজ স্থানে আসিয়া বসিতেন। লোকসংখ্যা অধিক হওয়ায় কেহ ঘরের সম্মুখে দালানে বেঞ্চি পাতিয়া কেহ বা রাস্তার ধারে রকটিতে অথবা রাস্তায় বেঞ্চি পাতিয়া বসিতেন; কারণ সকলের বসিবার জায়গা ঘরটির ভিতর হইত না।

ক্রমে ক্রমে স্ত্রীলোকেরাও পরমহংস মশাইকে দেখিতে আসিতে লাগিলেন। আমার মা-ও যাইতেন। বৈঠকখানার দক্ষিণ দিকে যে ছোট দালানটি ছিল সেইখানে মেয়েরা বসিতেন। মেয়েদের সংখ্যা তিরিশ চল্লিশ হইত; মেয়েরা যেদিকে বসিতেন, সেদিকে আলো দেওয়া হইত না। মাঝখানকার জানালা দুটির কবাট খোলা থাকিত, এবং পরমহংস মশাই-এর বসিবার জায়গা একটু জানালার দিক অর্থাৎ দক্ষিণ-পশ্চিম দিক করিয়া হইত। এইরূপ ব্যবস্থায়, স্ত্রীলোকেরা পরমহংস মশাইকে দেখিতে পাইতেন ও তাঁহার সকল কথা শুনিতে পাইতেন; কিন্তু সেখানে আলো না দেওয়ায়, ঘরের ভিতর হইতে কেহ মেয়েদের দেখিতে পাইত না। এই ছিল বসিবার বন্দোবস্ত। চিক বা পর্দা দিবার আবশ্যক হইত না।

রামদাদার অসুখের জন্য তামাকের কোনো বন্দোবস্ত ছিল না, তাহা পূর্বে বলিয়াছি। তামাক খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকার আরো একটি কারণ ছিল, পরমহংস মশাই-এর সম্মুখে কেহ তামাক খাইত না। পান দেওয়ারও কোনো ব্যবস্থা ছিল না; কারণ এখন যেমন বাড়িতে অভ্যাগত আসিলে পান দেওয়া হয়, তখন তেমন পান দেওয়ার রীতিই ছিল না।

Saturday, June 9, 2018

কীর্তনগায়ক যুবক

পরমহংস মশাই কিছু দিন আসিতে থাকিলে পর, রামদাদা একটি কীর্তনগায়ক ছেলেকে ভাড়া করিয়া লইয়া আসিলেন। ছেলেটির বয়স আঠারো কি উনিশ বৎসর হইবে। বাহিরের কোনো গ্রামের ছেলে, কলিকাতার নয়। ছেলেটি কোমরে চাদর বাঁধিয়া হাত নাড়িয়া নাড়িয়া কি এক দূতীসংবাদ গাহিল। আমরা কলিকাতার লোক; এ রকম গান করিলে ঠাট্টা করিতাম ও ঘৃণা করিতাম। আমাদের এ সব গান ভাল লাগিত না। আর জোয়ান বেটাছেলে হইয়া মেয়েলি ঢঙে হাত নাড়া, আমরা কলিকাতার লোক হইয়া বড় দূষণীয় মনে করিতাম। আমার মনে হইল - এ ছোঁড়া পড়াশুনা করে না, কেবল মেয়েদের মতো হাত নেড়ে গান করে। এইজন্য আমি তাহার উপর বিরক্ত হইলাম, কারণ কলিকাতায় তখন জিম্ন্যাস্টিক করা ও কুস্তি করাই ছিল প্রথা। জোয়ান ছেলের মেয়েলি ঢঙে হাত নাড়া ও সখী-সংবাদ গান করা অতি হাস্যকর বলিয়া মনে হইল; কিন্তু দেখিলাম কেহ কিছু বলিল না। অনেকক্ষণ কীর্তন হইবার পর পরমহংস মশাই উপরে আহার করিতে যাইলেন, এবং কিছু পরে আমরাও ছাদের উপর আহার করিতে যাইলাম।

আহার করিয়া আমরা নীচে নামিয়া আসিলে অনেকেই তখন চলিয়া যাইতে লাগিলেন। পরমহংস মশাই-এর গাড়ি আসিতে দেরি ছিল, এইজন্য বাহিরের ঘরটিতে বসিয়া তিনি সেই কীর্তনগায়ক ছেলেটিকে, কি করিয়া হাত নাড়িতে হয়, কোমর বাঁকাইয়া দাঁড়াইতে হয়, প্রভৃতি শিখাইতেছিলেন। ছেলেটিও দু-চার বার কস্ত করিয়া তাহা অভ্যাস করিতে লাগিল। আমি দরজার কাছে তক্তাপোশে বসিয়া এ সকল দেখিতেছিলাম ও মনে মনে হাসিতেছিলাম।

সেই কীর্তনগায়ক ছেলেটির নাম জানি না, এবং তাহাকে আর কখনো দেখিয়াছি কিনা তাহাও স্মরণ নাই।

ভাগবত-আলোচনা

পাড়ার মহেন্দ্র গোসাঁই, মাঝে মাঝে, পরমহংস মশাই-এর সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিতেন। মহেন্দ্র গোসাঁই-এর সহিত তাঁহার ভাগবত ও ভক্তি বিষয়ে নানারূপ আলোচনা হইত। মহেন্দ্র গোসাঁই তাঁহার কথাবার্তায় পরম আনন্দ অনুভব করিতেন। এক দিনকার কথা আমার একটু মাত্র মনে আছে। যেন এই ভাবের একটি কথা উঠিল - ভক্তি বড়, কি মুক্তি বড়? পরমহংস মশাই বলিলেন, "মুক্তি দিতে নারাজ নই, ভক্তি দিতে নারি।" তবে, সে সময় কথাবার্তা বিশেষ কিছু বুঝিতে পারি নাই। এইজন্য, স্পষ্টভাবে কিছু মনে নাই।

দেখিলাম, ভক্তির কথা উঠিলে পরমহংস মশাই পুরামাত্রায় বৈষ্ণব ভক্ত হইতেন, আবার যখন শ্যামা-বিষয়ক গান করিতেন তখন ঠিক সেই ভাবে তন্ময় হইয়া যাইতেন।

আহারের সময়

পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসিবেন জানিতে পারিলেই আমি সেখানে গিয়া উপস্থিত হইতাম। এক দিন, শনিবার সন্ধ্যার সময় পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসিয়াছিলেন। আমি কাপড়-চোপড় পরিয়া রামদাদার বাড়িতে যাইলাম। সকাল হইতে আমার খুব আমাশা হইয়াছিল সেইজন্য কিছুই খাই নাই; সাগু-বার্লিও নয়। ছাদে খাইতে যাইলাম, তখনো পেটে বড় যন্ত্রণা হইতেছিল। একখানি মাত্র পটল-ভাজা দিয়া গরম লুচি আকণ্ঠ খাইলাম, জল খাই নাই। কিন্তু তাহাতেই আমার আমাশা ভাল হইয়া গেল। পরে এক সময় বলরামবাবুকে1 এই কথা বলায়, তিনি বলিয়াছিলেন, "এই ঠিক ওষুধ, গরম লুচি হ'চ্ছে আমাশার ওষুধ। তুমি অজান্তে ঠিক ওষুধ খেয়েছিলে।"

আহার করিবার সময় পরমহংস মশাই উপরে যাইতেন। নীচের সিঁড়ি দিয়া উঠিয়া, দোতলায় পূর্ব-পশ্চিমমুখো যে দালানটি ছিল, সেখানে তাঁহার জন্য একটি আসন পাতা হইত। তিনি একলা বসিয়া আহার করিতেন, পঙ্ক্তির ভিতর বসিতেন না। সাদা পাথরের থালা ও গেলাসে তিনি কিছু আহার করিতেন। এই থালা ও গেলাস ইত্যাদি অপর কেহ ব্যবহার করিত না। সাধারণ লোক তেতলার ছাদে আহার করিত। দালানটি দিয়া তেতলায় যাইবার সিঁড়ি। ঠাঁই ও পরিবেশন করিবার জন্য লোকে এই দালান দিয়া উপরে যাতায়াত করিত। আহারের সময় ছাদের প্রায় সবটা ভরিয়া যাইত - আন্দাজ শ-দেড়েক লোক ছাদে একবারে বসিতে পারিত।

এক দিন দেখিলাম যে, পরমহংস মশাই দালানের মাঝখানটিতে বসিয়া আহার করিতেছেন, আর ভিন্ন ভিন্ন বাড়ির মেয়েরা আসিয়া তাঁহার বাঁ-দিকে ও সম্মুখে বসিয়া আছেন; কাহারো মাথায় ঘোমটা নাই; সকলের মুখ খোলা। তখনকার দিনে মুখের ঘোমটা খুলিয়া কোনো স্ত্রীলোকই পুরুষমানুষের সম্মুখে যাইতেন না। স্ত্রীলোকেরা সর্বদাই ঘোমটা দিয়া থাকিতেন। কিন্তু, আমি বিস্মিত হইয়া দেখিতে লাগিলাম যে, ভিন্ন বাড়ির ভিন্ন বয়স্কা স্ত্রীলোকেরা পরমহংস মশাই-এর কাছে মুখের কাপড় খুলিয়া বসিয়া আছেন, কোনো দ্বিধা বা সংকোচ করিতেছেন না; এমন কি, যে সকল যুবা পুরুষ উপরে পরিবেশন করিতে যাইতেছে, তাহারাও মাঝে মাঝে, দু-এক মিনিট দাঁড়াইয়া, পরমহংস মশাইকে দেখিয়া যাইতেছে। স্ত্রীলোকদিগের ভিতর সব বয়সেরই মেয়ে ছিল, কিন্তু অপরিচিত পুরুষদের দেখিয়া কেহই দ্বিধা বা সংকোচ করিল না; পুরুষরাও স্ত্রীলোকদের দেখিয়া দ্বিধা বা সংকোচ করিল না। পরমহংস মশাই তখন হাঁটু দুটি উঁচু করিয়া আসনখানির উপর বসিয়া কি আহার করিতেছিলেন।

কী আশ্চর্য ভাব! কাহারো মনে দ্বিধা বা সংকোচ নাই, লজ্জা বা কোনো প্রকার দৈহিক ভাব একেবারেই নাই। সকলেই পরমহংস মশাই-এর মুখের দিকে চাহিয়া আছেন, দেহজ্ঞান একেবারেই নাই। কে বা স্ত্রী কে বা পুরুষ - এ সব চিন্তা কাহারো নাই, যেন অন্য এক রাজ্যে সকলে রহিয়াছেন। অথচ সকলেই পরস্পর অচেনা।

এক বার যীশু Mount of Olives বা জলপাই পাহাড়ে মার্থা ও মেরী নামে দুই ভগিনীর বাড়িতে গিয়াছিলেন। মার্থা যীশুর সেবার জন্য বড়ই ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন, কিন্তু মেরী যীশুর পায়ের কাছে বসিয়া বিভোর হইয়া তাঁহার কথাবার্তা শুনিতে লাগিলেন। মার্থা আসিয়া যীশুর কাছে অভিযোগ করিলেন, "আপনি কি দেখছেন না, মেরী আমায় কাজে একলা ফেলে এসেছে? ওকে আমায় একটু সাহায্য করতে বলুন!" যীশু মার্থার দিকে মুখ ফিরাইয়া উত্তর করিলেন, "মার্থা, মার্থা তুমি বহু বিষয়ে উদ্বিগ্ন, বহু বিষয়ে ব্যস্ত। একটি জিনিস দরকারী এবং মেরী তা পাবার জন্য মনস্থ করেছে, যা তার কাছ থেকে অপহৃত হবে না।" - অর্থাৎ মেরী যে যীশুর কথা নিবিষ্টমনে শুনিতেছিলেন, তাহা অনেক উচ্চ স্তরের বিষয়, আহারাদি অনেক নিম্ন স্তরের কার্য।

আমি জেরুসালেম-এ অবস্থানকালে জলপাই পাহাড়ের এই স্থানটিতে সর্বদাই যাইতাম। এখন গ্রামটির নাম হইয়াছে এল' অ্যাজারিএ বা লাজারিএ, অর্থাৎ, লাজারস-এর গ্রাম। মার্থা ও মেরীর ভাই-এর নাম ছিল লাজারস। এই গ্রামটির প্রাচীন নাম ছিল বেথানী।

গৌতম কৃচ্ছ্রসাধন ত্যাগ করিবার সঙ্কল্প করিয়া উরুবিল্বে বা বুদ্ধগয়ায় যখন এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে ভিক্ষা গ্রহণ করিতে সম্মত হইলেন, তখন নন্দা আর বালা নামে ব্রাহ্মণের দুইটি কন্যকা, দুগ্ধ-মধু ইত্যাদি দিয়া কিছু আহার্য প্রস্তুত করিয়া আনিয়া সন্ন্যাসী গৌতমকে দিবার প্রয়াস পাইল। অনন্তর, সেবায় পরিতুষ্ট হইয়া গৌতম তাহাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। তাহাতে কন্যকা দুইটি এই আশীর্বাদ প্রার্থনা করিল, যেন শুদ্ধোদন রাজার পুত্র সিদ্ধার্থের সহিত তাহাদের বিবাহ হয় কারণ তাহারা শুনিয়াছিল যে, সিদ্ধার্থ অতি সুপুরুষ। গৌতম তাহাদের মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন, "ভগিনীদ্বয়, আমিই সেই শুদ্ধোদন রাজার পুত্র, সিদ্ধার্থ। আমি তো আর দারপরিগ্রহ করিব না।" কন্যকাদ্বয়, নন্দা ও বালা, তাহাতে কিছু অপ্রতিভ হইয়া মাথা হেঁট করিয়া রহিল। কিন্তু তাপস গৌতমের স্নিগ্ধ ও গম্ভীর ভাব দেখিয়া তাহাদের লজ্জা ও দ্বিধা বা সংকোচের ভাব চলিয়া যাইল। উভয়ে শান্তভাবে বলিল, "আপনি আশীর্বাদ করুন, আপনি সিদ্ধ হইলে যেন আমরা আপনার শিষ্যা হইতে পারি।"

দেখিয়াছি, পরমহংস মশাই-এর গা হইতে কি একটা আভা বাহির হইত, তাহাতে কাহারো দেহজ্ঞান বা অন্য কোনো ভাব থাকিত না; মন যেন দেহ ছাড়িয়া অপর কোন্ এক রাজ্যে চলিয়া যাইত, হাত-পা অজ্ঞাতসারে কাজ করিত মাত্র। যুবকেরা, পরিবেশন করিতে হয় সেইজন্যেই করিত, কিন্তু তাহাদের মনটা পরমহংস মশাই-এর কাছে পড়িয়া থাকিত। মেয়েদেরও ঠিক এই ভাবটি হইত। যাহাকে বলে - মুহূর্তের মধ্যে বিদেহ হইয়া যাওয়া, পরমহংস মশাই চকিতের ভিতর তাহা করিয়া দিতেন। এই ব্যাপারটি আমি ভাষা দিয়া বর্ণনা করিতে পারিলাম না। এ বিষয়ে চিন্তা করিলে কিছু মাত্র বুঝা যাইতে পারে। ইহা তর্ক-যুক্তির কথা নয়, গভীর ধ্যানের বিষয়। এইটি আমি বহুবার লক্ষ্য করিয়াছি।


1. শ্রীযুক্ত বলরাম বসু।

Tuesday, June 5, 2018

ছাপ মেরো না

যুবা শশী1 যখন রামদাদার বাড়িতে আসিতে লাগিল, বোধ হয় তখন সে 'সেকেন্ড ইয়ার ক্লাস' এ পড়ে। দেখিতে কৃশ, রং ফরসা। গালে কোঁকড়ানো কোঁকড়ানো কিছু দাড়ি, লম্বা দাড়ি নয়। যুবা শশীকে দেখিতাম যে, নিবিষ্টমনে কান খাড়া করিয়া পরমহংস মশাই-এর পিছনে ডান দিকে বসিত। যদিও সে মনোযোগ দিয়া ঐ সকল কথা শুনিত তবুও সে কিছু লিখিয়া রাখে নাই।

পরমহংস মশাই-এর আসিবার কিছু দিন পরে, ***মশাইকে রামদাদার বাড়িতে আসিতে দেখিলাম। পরমহংস মশাই-এর বাঁ-হাতের পিছন দিকটায়, দেওয়ালের আলমারির কাছে তিনি চুপটি করিয়া বসিয়া থাকিতেন এবং একমনে পরমহংস মশাই কি বলিতেছেন, তাহাই শুনিতে চেষ্টা করিতেন। সুরেশ মিত্তির তাঁহাকে বলিতেন, "কি ***, নোট করবে নাকি?"

পরমহংস মশাইকে এরূপ সময় দু-এক বার বলিতে শুনিয়াছি, "এ সকল কথায় ছাপ মেরো না।" তবে, তিনি কাহার উদ্দেশ্যে এবং কী অর্থে এই কথা বলিতেন, তাহা বলিতে পারি না। হয়তো, ইহার অর্থ এই হইতে পারে যে, এ সকল উচ্চ অঙ্গের কথা, এ সকল কথাকে ভাষায় প্রকাশ করিলে, ইহার ভাব বিকৃত হইয়া যাইবে, কিম্বা হাট-বাজারে এই সকল কথা দিও না, কারণ সাধারণ লোকে এই সকল উচ্চ অঙ্গের কথা বুঝিতে পারিবে না। অপর অর্থ এই হইতে পারে যে, এই সকল কথা ছাপাইয়া পয়সা করিও না; কারণ ব্রহ্মবাণী বেচিয়া পয়সা করা এবং নিজের স্বার্থের জন্য তাহা ব্যবহার করা দূষণীয়। ব্রহ্মবাণী কখনো স্বার্থের জন্য ব্যবহার করিতে নাই, - অযাচিতভাবে ইহা পাইয়াছ অযাচিতভাবে ইহা বিতরণ করিবে - এই হইল সনাতন প্রথা।


1. শ্রীযুত শশীভূষণ চক্রবর্তী, পরে স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ।

যুবা শশীর আক্ষেপ

পরমহংস মশাই-এর ডান হাতের কাছে যে জলের গেলাসটি থাকিত, সমাধি ভাঙিবার পর তাহা হইতে এক ঢোক জল খাইতেন। সমাধি ভাঙিলে, একটু জল খাইবার জন্য তিনি যখন হাত বাড়াইয়া দিতেন, তখন যুবা শশী সেই জলের গেলাসটি আগাইয়া দিত। এক দিন, ঘটনাক্রমে, সেই জলের গেলাসে তাহার পা ঠেকিয়া গিয়াছিল। জল বদলাইবার সময়ও ছিল না, অগত্যা সেই জলের গেলাসটিই পরমহংস মশাই-এর হাতে আগাইয়া দিতে হইল। পরমহংস মশাই সেই জলই পান করিলেন। যুবা শশীর মনে এই আক্ষেপ চিরকাল ছিল যে, সে জানিয়া শুনিয়া পরমহংস মশাইকে ঐ জল দিয়াছিল। যুবা শশী আক্ষেপ করিয়া অনেক সময় এ বিষয় উল্লেখ করিত। অবশ্য এইরূপ হইবার কারণ এই যে, ঐ জলের গেলাসটি তাহাকে চকিতের ভিতর আগাইয়া দিতে হইত, বোধ হয় এক সেকেন্ডের মধ্যে ঐ কাজ করিতে হইত।

কী সাজাবি আমায়

পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসিলে সুরেশ মিত্তির আনন্দে বিভোর হইয়া অনবরত পায়চারি করিতেন এবং সকল লোকের তত্ত্বাবধান করিতেন। তিনি ভাবে এত মাতোয়ারা হইয়া পড়িতেন যে, কখনো ঘরটির ভিতর বসিতে পারিতেন না।

গরমিকালে, এক দিন সুরেশ মিত্তির ফরমাশ দিয়া একটি অতি সুন্দর বেলফুলের গ'ড়ে মালা আনাইয়াছিলেন। মালাটি বেশ বড়; এত বড় যে, গলায় দিয়া দাঁড়াইলে মালাটি জাজিমের উপর পড়িয়া আরো খানিকটা বেশী থাকে। মালাটি নীচের দিকে কতকগুলি ফুল দিয়া একটি তোড়ার মতো করা - ফুলের থোব্না, আর মালার মাঝে মাঝে রঙিন ফুল ও জরি দেওয়া তবক। মালাটি যতদূর সম্ভব উৎকৃষ্ট। সুরেশ মিত্তির আনন্দে বড় অধীর হইয়া উঠিয়াছেন। তিনি একটি রূপার বাটিতে গোলাপজল ঢালিয়া বাঁ-হাতে লইয়াছেন, ডান হাতে একটি রূপার ঝাঁজরিওয়ালা পিচকারি, চোঙামুখো নয়। রূপার পিচকারিটি দুই আঙুল দিয়া ধরিবার জন্য দুটি আঙটা বা কড়া আছে, এবং পিচকারির ডাঁটিটি বুড়ো আঙুল দিয়া তুলিবার জন্যও একটি আঙটা বা কড়া আছে। সুরেশ মিত্তির পিচকারি দিয়া সকলের মাথায় গোলাপজল দিতেছেন। তাহার পর, ঐ মালাটি লইয়া পরমহংস মশাই-এর গলায় পরাইয়া দিয়া পায়ের কাছে প্রণাম করিলেন। পরমহংস মশাই দাঁড়াইয়া উঠিলেন। মালাটি তক্তাপোশের উপর জাজিমে ঠেকিয়া লুটাইতে লাগিল। পরমহংস মশাই-এর সমাধি-অবস্থা আসিতে লাগিল। কখনো বা তিনি ডান হাতের আঙুল দিয়া নিজের শরীরের দিকে দেখাইতে লাগিলেন, কখনো বা উপর দিকে নির্দেশ করিতে লাগিলেন, ও মৃদু মৃদু স্বরে এই গানটি গাহিতে শুরু করিলেন:

"আর কী সাজাবি আমায়
জগত-চন্দ্র-হার আমি পরেছি গলায় * *।"

গানটি গাহিয়া নানা প্রকার হাতের ভঙ্গী করিয়া উপরের দিকে দেখাইতে লাগিলেন। ঠিক যেন এই ভাবটি তখন প্রকাশ হইতে লাগিল - কি একটা ফুলের মালা গলায় পরাচ্ছ; আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র সব তো আমার গলায় হারের মতো রয়েছে। অর্থাৎ এই ক্ষুদ্র দেহটির ভিতর এক বিরাট পুরুষ রহিয়াছেন; চন্দ্রাদি গ্রহসমূহ তাঁহার গলার হারের মতো; তিনি আরো ঊর্ধ্বের লোক - তিনি বিরাট, অসীম, অনন্ত ও মহান। এই ক্ষুদ্র দেহটিতে একটি ক্ষুদ্র মালা পরাইয়া কী-বা আশ্চর্য কাজ করিতেছে।

গানটি তিনবার বলিয়াই তিনি সমাধিস্থ হইয়া যাইলেন। কিন্তু, তাঁহার কণ্ঠস্বর এত করুণ ও হৃদয়গ্রাহী হইয়াছিল যে, সেই কণ্ঠস্বর এখনো আমার কানে লাগিয়া রহিয়াছে। তিনি যেন হাত নাড়িয়া বলিতেছেন: জগৎ তুচ্ছ; জগতের এই জিনিস দিয়ে আমায় কী সাজাবে? অনন্ত, অনন্ত সব গ্রহ-তারা, আমি তো সর্বদাই সেই সকল প'রে থাকি। তার চেয়ে আমার মাথা আরো উপরে।

এই বিষয়টি আমার ভাষায় প্রকাশ করিবার শক্তি নাই। মুখের ভাব হাতের ভঙ্গী ও কণ্ঠের স্বর দিয়া তিনি এমন একটি ভাব ব্যক্ত করিয়াছিলেন যে, অসীম অনন্তের ভাবটি স্পষ্ট প্রকাশ পাইয়াছিল। 'শব্দ' হইতে মনকে 'শক্তি'-তে লইয়া যাওয়া ইহাকেই বলে। আমরা তো প্রথমে ফুলের মালা দেখিয়াই খুব আশ্চর্যান্বিত হইয়াছিলাম; কিন্তু এই গানটি বা নাদব্রহ্ম শুনিয়া মন অন্য প্রকার হইয়া গিয়াছিল।

Saturday, June 2, 2018

কীর্তন ও নৃত্যে

অনেক সময় বৈঠকখানায় কথাবার্তা শেষ হইলে পরমহংস মশাই দক্ষিণ দিকের ছোট উঠানটিতে গিয়া কীর্তন করিতেন। এই সময় দেখিতাম যে, পরমহংস মশাই তাঁহার কোঁচার কাপড়টি ফেটি করিয়া কোমরে বাঁধিতেন, অর্থাৎ কোঁচার কাপড়টি কোমরে দিয়া একটি গাঁট-বাঁধা করিতেন। জামাটি গায়ে থাকিত। অন্য সময় তিনি কখনো কাপড়টি কোঁচা দিয়া রাখিতেন, কখনো বা কোঁচাটি খুলিয়া লম্বা চাদরের মতো করিয়া কাঁধে ফেলিতেন। তিনি উঠানের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণটিতে উত্তর দিকে মুখ করিয়া দাঁড়াইতেন। রামদাদা প্রায়ই তাঁহার ডান হাতের কাছে দাঁড়াইতেন। মনোমোহনদাদা বাঁ-হাতের কাছে দাঁড়াইতেন। অপর সকল ব্যক্তি মাঝে খানিকটা ফাঁক রাখিয়া পূর্ব দিকে ও উত্তর দিকে দাঁড়াইয়া থাকিতেন। নরেন্দ্রনাথ ও অঘোর ভাদুড়ী (ডাক্তার বিহারী ভাদুড়ীর জ্যেষ্ঠ পুত্র), ইহারা দুই জন উত্তর দিকের দেওয়ালের কাছে দাঁড়াইয়া থাকিত। নরেন্দ্রনাথ সেই সময় চোখ বুজাইয়া ধ্যানের ভাবে থাকিত। যুবা রাখাল বড় লাজুক ছিল এইজন্য সে ভিড়ের ভিতর পিছনে লুকাইয়া থাকিত কখনো সম্মুখে যাইত না। কখনো কখনো রামদাদার অপর এক মাসতুতো ভাই নৃত্যগোপালদাদাও1 কীর্তনে থাকিতেন।

রামদাদা ও মনোমোহনদাদা প্রথমে কীর্তনের গান আরম্ভ করিতেন। কীর্তনে খোল-খত্তাল বাজিত না। এক দিনকার কীর্তনের গান একটু স্মরণ আছে। গানটি হইল:

"হরি বলে আমার গৌর নাচে,
নাচে রে গৌরাঙ্গ আমার হেমগিরির মাঝে * *।"

এইটুকু আমার স্মরণ আছে আর কিছু স্মরণ নাই। রামদাদা ও মনোমোহনদাদা কীর্তনের গান আরম্ভ করিলে, পরমহংস মশাই মৃদুস্বরে সামান্য কীর্তন গাহিতেন এবং মাঝে মাঝে করতালি দিতেন। তাহার পর তাঁহার ভাবাবেশ হইত, একেবারে বিভোর হইয়া যাইতেন, তখন ঘাড় একটু ডান দিকে বাঁকিয়া যাইত, চোখ নিমীলিত হইত। তিনি তখন হাত দুটি সম্মুখের দিকে লম্বা করিয়া প্রসারিত করিতেন এবং ভাবের আবেশে সম্মুখের দিকে কয়েক হাত অগ্রসর হইয়া যাইতেন ও আবার পিছন দিকে ফিরিয়া আসিতেন। এইরূপ ভাবাবেশে যখন তিনি সম্মুখে ও পিছনে চলাচল করিতেন, তখন কেবল রামদাদা ও মনোমোহনদাদা কীর্তন করিতে করিতে ঠিক সঙ্গে সঙ্গে চলিতেন। এই নৃত্যের সময় পরমহংস মশাই-এর মুখ দিয়া কোনো কথা বাহির হইত না। তিনি তখন একেবারে ভাবে বিভোর হইয়া যাইতেন, ঘাড়টি বাঁকাইয়া অতি গম্ভীর মুখ করিয়া সম্মুখে ও পিছনে কেবল যাওয়া-আসা করিতেন। রামদাদা ও মনোমোহনদাদা বা অপর কেহই কীর্তনে নৃত্য করিতেন না। সুরেশ মিত্তিরকে কখনো কীর্তনে নৃত্য করিতে দেখি নাই। তিনি চশমাটি চোখে দিয়া পূর্ব দিকের ছোট দালানটির এক ধারে স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিতেন, কখনো বা দুই হাতে সামান্যভাবে একটু করতালি দিতেন। মাস্টারমশাইকে কীর্তনে নৃত্য করিতে দেখি নাই। অপর সকলেও স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিতেন। এইরূপ, মিনিট আট-দশ চলাচল করিয়া পরমহংস মশাই স্থির হইয়া যাইতেন, আর যেন কিছু বাহ্যজ্ঞান থাকিত না। সেই সময়, রামদাদা ও মনোমোহনদাদা তাঁহাকে পরিক্রম করিয়া করতালি দিয়া কীর্তন করিয়া বেড়াইতেন। পরমহংস মশাই-এর দেহ সেই সময় নিশ্চল ও নিস্পন্দ হইয়া যাইত। এইরূপ খানিকক্ষণ থাকিবার পর আবার তিনি প্রকৃতিস্থ হইতেন। প্রায় আধ ঘণ্টা কাল কীর্তন হইবার পর, সকলে পুনরায় বাহিরের ঘরটিতে আসিয়া বসিলে আহারাদির উদ্যোগ হইত। ছোট উঠানটিতে বহুবার পরমহংস মশাই-এর কীর্তন হইয়াছিল, তবে সব বারই প্রায় এইরূপ এক প্রথা অনুযায়ী।


1. শ্রীযুত নৃত্যগোপাল বসু, পরে স্বামী জ্ঞানানন্দ অবধূত।

পায়ে প্রণাম

গরমিকাল, এক দিন সকলের আহার হইয়া গিয়াছে, মুখ ধুইতে সকলে নীচে চলিয়া যাইল। পরমহংস মশাই উপরকার ছাদে যাইলেন; গায়ে ছোট আস্তিনওয়ালা একটি জামা, পায়ে বার্নিশ করা চটি-জুতা। পান খাইয়াছিলেন; ঠোঁট মুছিলেন। পূর্ব দিকের পাঁচিলে ঠেস দিয়া দাঁড়াইলেন! দাদা আমাকে ডাকিয়া পরমহংস মশাই-এর কাছে লইয়া গেল। আমি তাঁহার পায়ের কাছে মাথা রাখিয়া প্রণাম করিলাম। তখনকার দিনে পায়ের কাছে মাথা রাখিয়া প্রণাম করার প্রথা একেবারেই উঠিয়া গিয়াছিল। বোধ হয় পায়ের কাছে মাথা রাখিয়া এই আমার প্রথম প্রণাম করা। পরমহংস মশাই দেওয়ালে ঠেস দিয়া দাঁড়াইয়া আমার সঙ্গে অতি স্নেহের সহিত অনেক কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন। দাদাও দাঁড়াইয়া রহিল। আমিও পরমহংস মশাই-এর কাছে দাঁড়াইয়া রহিলাম। তিনি আমাকে খুব আশীর্বাদ করিলেন। ভিড় কমিয়া যাইলে আমি নীচে নামিয়া আসিলাম।