Saturday, June 9, 2018

আহারের সময়

পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসিবেন জানিতে পারিলেই আমি সেখানে গিয়া উপস্থিত হইতাম। এক দিন, শনিবার সন্ধ্যার সময় পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসিয়াছিলেন। আমি কাপড়-চোপড় পরিয়া রামদাদার বাড়িতে যাইলাম। সকাল হইতে আমার খুব আমাশা হইয়াছিল সেইজন্য কিছুই খাই নাই; সাগু-বার্লিও নয়। ছাদে খাইতে যাইলাম, তখনো পেটে বড় যন্ত্রণা হইতেছিল। একখানি মাত্র পটল-ভাজা দিয়া গরম লুচি আকণ্ঠ খাইলাম, জল খাই নাই। কিন্তু তাহাতেই আমার আমাশা ভাল হইয়া গেল। পরে এক সময় বলরামবাবুকে1 এই কথা বলায়, তিনি বলিয়াছিলেন, "এই ঠিক ওষুধ, গরম লুচি হ'চ্ছে আমাশার ওষুধ। তুমি অজান্তে ঠিক ওষুধ খেয়েছিলে।"

আহার করিবার সময় পরমহংস মশাই উপরে যাইতেন। নীচের সিঁড়ি দিয়া উঠিয়া, দোতলায় পূর্ব-পশ্চিমমুখো যে দালানটি ছিল, সেখানে তাঁহার জন্য একটি আসন পাতা হইত। তিনি একলা বসিয়া আহার করিতেন, পঙ্ক্তির ভিতর বসিতেন না। সাদা পাথরের থালা ও গেলাসে তিনি কিছু আহার করিতেন। এই থালা ও গেলাস ইত্যাদি অপর কেহ ব্যবহার করিত না। সাধারণ লোক তেতলার ছাদে আহার করিত। দালানটি দিয়া তেতলায় যাইবার সিঁড়ি। ঠাঁই ও পরিবেশন করিবার জন্য লোকে এই দালান দিয়া উপরে যাতায়াত করিত। আহারের সময় ছাদের প্রায় সবটা ভরিয়া যাইত - আন্দাজ শ-দেড়েক লোক ছাদে একবারে বসিতে পারিত।

এক দিন দেখিলাম যে, পরমহংস মশাই দালানের মাঝখানটিতে বসিয়া আহার করিতেছেন, আর ভিন্ন ভিন্ন বাড়ির মেয়েরা আসিয়া তাঁহার বাঁ-দিকে ও সম্মুখে বসিয়া আছেন; কাহারো মাথায় ঘোমটা নাই; সকলের মুখ খোলা। তখনকার দিনে মুখের ঘোমটা খুলিয়া কোনো স্ত্রীলোকই পুরুষমানুষের সম্মুখে যাইতেন না। স্ত্রীলোকেরা সর্বদাই ঘোমটা দিয়া থাকিতেন। কিন্তু, আমি বিস্মিত হইয়া দেখিতে লাগিলাম যে, ভিন্ন বাড়ির ভিন্ন বয়স্কা স্ত্রীলোকেরা পরমহংস মশাই-এর কাছে মুখের কাপড় খুলিয়া বসিয়া আছেন, কোনো দ্বিধা বা সংকোচ করিতেছেন না; এমন কি, যে সকল যুবা পুরুষ উপরে পরিবেশন করিতে যাইতেছে, তাহারাও মাঝে মাঝে, দু-এক মিনিট দাঁড়াইয়া, পরমহংস মশাইকে দেখিয়া যাইতেছে। স্ত্রীলোকদিগের ভিতর সব বয়সেরই মেয়ে ছিল, কিন্তু অপরিচিত পুরুষদের দেখিয়া কেহই দ্বিধা বা সংকোচ করিল না; পুরুষরাও স্ত্রীলোকদের দেখিয়া দ্বিধা বা সংকোচ করিল না। পরমহংস মশাই তখন হাঁটু দুটি উঁচু করিয়া আসনখানির উপর বসিয়া কি আহার করিতেছিলেন।

কী আশ্চর্য ভাব! কাহারো মনে দ্বিধা বা সংকোচ নাই, লজ্জা বা কোনো প্রকার দৈহিক ভাব একেবারেই নাই। সকলেই পরমহংস মশাই-এর মুখের দিকে চাহিয়া আছেন, দেহজ্ঞান একেবারেই নাই। কে বা স্ত্রী কে বা পুরুষ - এ সব চিন্তা কাহারো নাই, যেন অন্য এক রাজ্যে সকলে রহিয়াছেন। অথচ সকলেই পরস্পর অচেনা।

এক বার যীশু Mount of Olives বা জলপাই পাহাড়ে মার্থা ও মেরী নামে দুই ভগিনীর বাড়িতে গিয়াছিলেন। মার্থা যীশুর সেবার জন্য বড়ই ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন, কিন্তু মেরী যীশুর পায়ের কাছে বসিয়া বিভোর হইয়া তাঁহার কথাবার্তা শুনিতে লাগিলেন। মার্থা আসিয়া যীশুর কাছে অভিযোগ করিলেন, "আপনি কি দেখছেন না, মেরী আমায় কাজে একলা ফেলে এসেছে? ওকে আমায় একটু সাহায্য করতে বলুন!" যীশু মার্থার দিকে মুখ ফিরাইয়া উত্তর করিলেন, "মার্থা, মার্থা তুমি বহু বিষয়ে উদ্বিগ্ন, বহু বিষয়ে ব্যস্ত। একটি জিনিস দরকারী এবং মেরী তা পাবার জন্য মনস্থ করেছে, যা তার কাছ থেকে অপহৃত হবে না।" - অর্থাৎ মেরী যে যীশুর কথা নিবিষ্টমনে শুনিতেছিলেন, তাহা অনেক উচ্চ স্তরের বিষয়, আহারাদি অনেক নিম্ন স্তরের কার্য।

আমি জেরুসালেম-এ অবস্থানকালে জলপাই পাহাড়ের এই স্থানটিতে সর্বদাই যাইতাম। এখন গ্রামটির নাম হইয়াছে এল' অ্যাজারিএ বা লাজারিএ, অর্থাৎ, লাজারস-এর গ্রাম। মার্থা ও মেরীর ভাই-এর নাম ছিল লাজারস। এই গ্রামটির প্রাচীন নাম ছিল বেথানী।

গৌতম কৃচ্ছ্রসাধন ত্যাগ করিবার সঙ্কল্প করিয়া উরুবিল্বে বা বুদ্ধগয়ায় যখন এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে ভিক্ষা গ্রহণ করিতে সম্মত হইলেন, তখন নন্দা আর বালা নামে ব্রাহ্মণের দুইটি কন্যকা, দুগ্ধ-মধু ইত্যাদি দিয়া কিছু আহার্য প্রস্তুত করিয়া আনিয়া সন্ন্যাসী গৌতমকে দিবার প্রয়াস পাইল। অনন্তর, সেবায় পরিতুষ্ট হইয়া গৌতম তাহাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। তাহাতে কন্যকা দুইটি এই আশীর্বাদ প্রার্থনা করিল, যেন শুদ্ধোদন রাজার পুত্র সিদ্ধার্থের সহিত তাহাদের বিবাহ হয় কারণ তাহারা শুনিয়াছিল যে, সিদ্ধার্থ অতি সুপুরুষ। গৌতম তাহাদের মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন, "ভগিনীদ্বয়, আমিই সেই শুদ্ধোদন রাজার পুত্র, সিদ্ধার্থ। আমি তো আর দারপরিগ্রহ করিব না।" কন্যকাদ্বয়, নন্দা ও বালা, তাহাতে কিছু অপ্রতিভ হইয়া মাথা হেঁট করিয়া রহিল। কিন্তু তাপস গৌতমের স্নিগ্ধ ও গম্ভীর ভাব দেখিয়া তাহাদের লজ্জা ও দ্বিধা বা সংকোচের ভাব চলিয়া যাইল। উভয়ে শান্তভাবে বলিল, "আপনি আশীর্বাদ করুন, আপনি সিদ্ধ হইলে যেন আমরা আপনার শিষ্যা হইতে পারি।"

দেখিয়াছি, পরমহংস মশাই-এর গা হইতে কি একটা আভা বাহির হইত, তাহাতে কাহারো দেহজ্ঞান বা অন্য কোনো ভাব থাকিত না; মন যেন দেহ ছাড়িয়া অপর কোন্ এক রাজ্যে চলিয়া যাইত, হাত-পা অজ্ঞাতসারে কাজ করিত মাত্র। যুবকেরা, পরিবেশন করিতে হয় সেইজন্যেই করিত, কিন্তু তাহাদের মনটা পরমহংস মশাই-এর কাছে পড়িয়া থাকিত। মেয়েদেরও ঠিক এই ভাবটি হইত। যাহাকে বলে - মুহূর্তের মধ্যে বিদেহ হইয়া যাওয়া, পরমহংস মশাই চকিতের ভিতর তাহা করিয়া দিতেন। এই ব্যাপারটি আমি ভাষা দিয়া বর্ণনা করিতে পারিলাম না। এ বিষয়ে চিন্তা করিলে কিছু মাত্র বুঝা যাইতে পারে। ইহা তর্ক-যুক্তির কথা নয়, গভীর ধ্যানের বিষয়। এইটি আমি বহুবার লক্ষ্য করিয়াছি।


1. শ্রীযুক্ত বলরাম বসু।

No comments:

Post a Comment