অনেক সময় বৈঠকখানায় কথাবার্তা শেষ হইলে পরমহংস মশাই দক্ষিণ দিকের ছোট উঠানটিতে গিয়া কীর্তন করিতেন। এই সময় দেখিতাম যে, পরমহংস মশাই তাঁহার কোঁচার কাপড়টি ফেটি করিয়া কোমরে বাঁধিতেন, অর্থাৎ কোঁচার কাপড়টি কোমরে দিয়া একটি গাঁট-বাঁধা করিতেন। জামাটি গায়ে থাকিত। অন্য সময় তিনি কখনো কাপড়টি কোঁচা দিয়া রাখিতেন, কখনো বা কোঁচাটি খুলিয়া লম্বা চাদরের মতো করিয়া কাঁধে ফেলিতেন। তিনি উঠানের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণটিতে উত্তর দিকে মুখ করিয়া দাঁড়াইতেন। রামদাদা প্রায়ই তাঁহার ডান হাতের কাছে দাঁড়াইতেন। মনোমোহনদাদা বাঁ-হাতের কাছে দাঁড়াইতেন। অপর সকল ব্যক্তি মাঝে খানিকটা ফাঁক রাখিয়া পূর্ব দিকে ও উত্তর দিকে দাঁড়াইয়া থাকিতেন। নরেন্দ্রনাথ ও অঘোর ভাদুড়ী (ডাক্তার বিহারী ভাদুড়ীর জ্যেষ্ঠ পুত্র), ইহারা দুই জন উত্তর দিকের দেওয়ালের কাছে দাঁড়াইয়া থাকিত। নরেন্দ্রনাথ সেই সময় চোখ বুজাইয়া ধ্যানের ভাবে থাকিত। যুবা রাখাল বড় লাজুক ছিল এইজন্য সে ভিড়ের ভিতর পিছনে লুকাইয়া থাকিত কখনো সম্মুখে যাইত না। কখনো কখনো রামদাদার অপর এক মাসতুতো ভাই নৃত্যগোপালদাদাও1 কীর্তনে থাকিতেন।
রামদাদা ও মনোমোহনদাদা প্রথমে কীর্তনের গান আরম্ভ করিতেন। কীর্তনে খোল-খত্তাল বাজিত না। এক দিনকার কীর্তনের গান একটু স্মরণ আছে। গানটি হইল:
"হরি বলে আমার গৌর নাচে,
নাচে রে গৌরাঙ্গ আমার হেমগিরির মাঝে * *।"
এইটুকু আমার স্মরণ আছে আর কিছু স্মরণ নাই। রামদাদা ও মনোমোহনদাদা কীর্তনের গান আরম্ভ করিলে, পরমহংস মশাই মৃদুস্বরে সামান্য কীর্তন গাহিতেন এবং মাঝে মাঝে করতালি দিতেন। তাহার পর তাঁহার ভাবাবেশ হইত, একেবারে বিভোর হইয়া যাইতেন, তখন ঘাড় একটু ডান দিকে বাঁকিয়া যাইত, চোখ নিমীলিত হইত। তিনি তখন হাত দুটি সম্মুখের দিকে লম্বা করিয়া প্রসারিত করিতেন এবং ভাবের আবেশে সম্মুখের দিকে কয়েক হাত অগ্রসর হইয়া যাইতেন ও আবার পিছন দিকে ফিরিয়া আসিতেন। এইরূপ ভাবাবেশে যখন তিনি সম্মুখে ও পিছনে চলাচল করিতেন, তখন কেবল রামদাদা ও মনোমোহনদাদা কীর্তন করিতে করিতে ঠিক সঙ্গে সঙ্গে চলিতেন। এই নৃত্যের সময় পরমহংস মশাই-এর মুখ দিয়া কোনো কথা বাহির হইত না। তিনি তখন একেবারে ভাবে বিভোর হইয়া যাইতেন, ঘাড়টি বাঁকাইয়া অতি গম্ভীর মুখ করিয়া সম্মুখে ও পিছনে কেবল যাওয়া-আসা করিতেন। রামদাদা ও মনোমোহনদাদা বা অপর কেহই কীর্তনে নৃত্য করিতেন না। সুরেশ মিত্তিরকে কখনো কীর্তনে নৃত্য করিতে দেখি নাই। তিনি চশমাটি চোখে দিয়া পূর্ব দিকের ছোট দালানটির এক ধারে স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিতেন, কখনো বা দুই হাতে সামান্যভাবে একটু করতালি দিতেন। মাস্টারমশাইকে কীর্তনে নৃত্য করিতে দেখি নাই। অপর সকলেও স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিতেন। এইরূপ, মিনিট আট-দশ চলাচল করিয়া পরমহংস মশাই স্থির হইয়া যাইতেন, আর যেন কিছু বাহ্যজ্ঞান থাকিত না। সেই সময়, রামদাদা ও মনোমোহনদাদা তাঁহাকে পরিক্রম করিয়া করতালি দিয়া কীর্তন করিয়া বেড়াইতেন। পরমহংস মশাই-এর দেহ সেই সময় নিশ্চল ও নিস্পন্দ হইয়া যাইত। এইরূপ খানিকক্ষণ থাকিবার পর আবার তিনি প্রকৃতিস্থ হইতেন। প্রায় আধ ঘণ্টা কাল কীর্তন হইবার পর, সকলে পুনরায় বাহিরের ঘরটিতে আসিয়া বসিলে আহারাদির উদ্যোগ হইত। ছোট উঠানটিতে বহুবার পরমহংস মশাই-এর কীর্তন হইয়াছিল, তবে সব বারই প্রায় এইরূপ এক প্রথা অনুযায়ী।
1. শ্রীযুত নৃত্যগোপাল বসু, পরে স্বামী জ্ঞানানন্দ অবধূত।↩
No comments:
Post a Comment