রামদাদাদের পূর্বকার বাড়ি ছিল কলিকাতার পূর্ব প্রান্তে, নারিকেলডাঙ্গায়। এই বাড়ি নষ্ট হইয়া যায়। রামদাদা শিমলায় বাড়ি তৈয়ার করিয়াছিলেন। বাড়ির ঠিকানা ছিল - এগারো নম্বর মধু রায় লেন। এই লেন বা গলিটি ছোট; পূর্ব-পশ্চিম বরাবর। এই বাড়িতেই পরমহংস মশাই সর্বদা আসিতেন। বাড়িটি গলির দক্ষিণ দিকে। বাড়িটির সদর দরজা ছিল উত্তরমুখো। দক্ষিণমুখো হইয়া সদর দরজায় ঢুকিতে, ডান দিক হইতে পশ্চিম দিকের দেওয়াল পর্যন্ত, বাহিরে একটি সরু ও লম্বা রক ছিল। দরজায় ঢুকিয়া সম্মুখে, একটা পথ বা দালান বা একটা বড় ঘরের মাপের মতো জায়গা; এবং ডান ধারে, অর্থাৎ, পশ্চিম দিকে, তিনটি দরজাওয়ালা একটি বৈঠকখানা। এই ঘরটির উত্তর দিকে, অর্থাৎ রাস্তার দিকে, লোহার গরাদেওয়ালা দুইটি জানালা; এবং দক্ষিণ দিকে, গরাদেওয়ালা অনুরূপ দুইটি জানালা ছিল। পশ্চিম দিকের দেওয়ালের মাঝখানে সার্শিদেওয়া তাক; এবং তাহার দুই পাশে দুইটি খালি ফোকর, অর্থাৎ তাহাতে তাক ছিল না। সদর দরজার সম্মুখের পথটি বা দালানটি দিয়া দক্ষিণ দিকে বা ভিতর দিকে যাইলে, ছোট একটি দালান। দালানটি হইল পূর্ব-পশ্চিমমুখো বা বরাবর। দালানের দক্ষিণ দিকে, ছোট একটুখানি উঠান। উঠানটির বাঁ-দিকে বা পূর্ব দিকে, দুইটি থামওয়ালা একটুখানি দালান; এবং ঠিক দক্ষিণ দিকে, একটি লম্বা ঘর। উঠানের ডান দিকে বা পশ্চিম দিকের দেওয়ালের কাছে, উপরে উঠিবার সিঁড়ি। সিঁড়িটিতে দক্ষিণমুখো হইয়া উঠিতে হইত। সিঁড়ি দিয়া উঠিতে বাঁ-দিকে বা মাঝের চাতালের দক্ষিণ দিকে একটি কুঠরি বা ছোট ঘর। এই ঘরটিতে শিবানন্দ স্বামী কিছুকাল তপস্যা করিয়াছিলেন। তাহার পর, সিঁড়িটি ধরিয়া ঘুরিয়া গিয়া দোতলায় উত্তরমুখো হইয়া উঠিলে, প্রথমে, সম্মুখে একটি কল-ঘর; এবং পূর্ব দিকে মুখ করিলে, একটি লম্বা দালান। দালানটির উত্তর দিকে, নীচুকার বৈঠকখানা ও সদর দরজার দালানের রুজু, দুইটি ঘর। বাড়ির উপরে, দোতালায়, পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে, আরো দুইটি ঘর ছিল; এবং নীচুকার পূর্ব দিকের বর্ণিত ছোট দালানের উপরেও আর একটি ঘর ছিল। দোতালার সিঁড়িটি আবার ঘুরিয়া গিয়া তেতলার ছাদে উঠিয়াছে। এই হইল রামদাদার বাড়ির মোটামুটি বর্ণনা। ইহা হইল ১৮৮২ বা ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দের কথা।
বোধ হয়, এই বৎসরেরই গরমিকালে, বৈকালবেলায়, পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসিলেন। দিনটি শনিবার কি রবিবার হইবে। আমি সন্ধ্যার সময় যাইলাম। যাইয়া বৈঠকখানার তৃতীয় দরজাটির সম্মুখে, অর্থাৎ দক্ষিণ দেওয়ালের নিকট যে দরজাটি তাহার সম্মুখে বসিলাম। ঘরটিতে প্রায় পনেরো হইতে বিশ জন লোক বসিয়াছিল, এবং বাহিরে দালানটিতেও প্রায় ততগুলি লোক ছিল। বোধ হয় মোট লোকসংখ্যা চল্লিশ হইতে পঞ্চাশ হইবে। পূর্বেই বলিয়াছি, তখনকার দিনে প্রণাম করিবার প্রথা উঠিয়া গিয়াছিল। এইজন্য তখনকার রীতি অনুযায়ী প্রণাম না করিয়া দরজার নিকটে চুপ করিয়া বসিলাম; কেহ প্রণাম করিত না, আমিও করিলাম না। দাদা পূর্বেই আসিয়াছিল; বৈঠকখানাতে তিনখানি তক্তাপোশ পাতা ছিল, তাহার উপর শতরঞ্জি ও জাজিম বিছানো এবং কয়েকটি তাকিয়া ছিল। তামাকের কোন বন্দোবস্ত ছিল না; কারণ রামদাদার হাঁপানি ব্যামো থাকায় তামাকের ধোঁয়াতে হাঁপানি বাড়িত। ঘরটির কড়ি-কাঠ হইতে, কাঁচের বাটির মতো দেখিতে, দুইটি গ্যাসের বাতি জ্বলিতেছে। পরমহংস মশাই পশ্চিম দিকের আলমারির বা সার্শি-দেওয়া তাকের কাছে বসিয়া আছেন, পিছনে একটি তাকিয়া। দেবেন মজুমদার মশাই1 তৃতীয় দরজার মাঝখানটিতে বসিয়াছেন; তাঁহার পরনের কাপড়খানি বেশ ফরসা ও কোঁচানো; হাঁটুর উপর কাপড়খানি রাখিয়াছেন; আর কোঁচানো উড়ুনিখানিও দু-ভাঁজ করিয়া দুই হাঁটুর উপর রাখিয়াছেন; গায়ে পিরান নাই, গলায় পইতা। দেবেন মজুমদার মশাই বরাবর আমাদের বাড়িতে আসিতেন, এইজন্য বহুকাল হইতে তিনি আমাদের পরিচিত ছিলেন। পাড়ার বৃদ্ধ কালীপদ সরকার মশাই-ও ঘরে বসিয়াছিলেন। বাকি আর সকলে অন্য জায়গার লোক ছিলেন, তাঁহাদের চিনিতাম না। সুরেশ মিত্তির প্রণাম করিয়া অস্থির হইয়া পায়চারি করিতেছেন, যেন ভাবে ও আনন্দে স্থির হইয়া বসিবার সামর্থ্যও নাই। রামদাদা এদিক-সেদিক করিতেছেন। গরমিকাল; ঘরটির ভিতরে গরম ছিল, এইজন্য দাদা রাস্তার ধারের রকটিতে বসিল। রাখাল লাজুক ছিল, সে ঘরের ভিতর না ঢুকিয়া এদিক-ওদিক কোথায় রহিল। রামদাদার মাসতুতো ভাই, মনোমোহনদাদা (রাখালের নিজ শ্যালক) ঘরের ভিতর চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন।
আমার প্রথম এইরূপ মনে হইল - দক্ষিণেশ্বর থেকে এই যে লোকটি এসেছে, একেই কি বলে 'পরমহংস'? দেখিলাম লোকটির চেহারাতে কোন বৈশিষ্ট্য নাই, চেহারা সাধারণ পাড়াগেঁয়ে লোকের মতো; বর্ণ খুব কালো নয়, তবে, কলিকাতার সাধারণ লোকের বর্ণ হইতে কিছু মলিন। গালে একটু একটু দাড়ি আছে, কপচানো দাড়ি। চোখ দুটি ছোট - যাহাকে বলে, 'হাতি চোখ'। চোখের পাতা অনবরত মিটমিট করিতেছে, যেন অধিক পরিমাণে চোখ নড়িতেছে। ঠোঁট দুটি পাতলা নয়। নীচুকার ঠোঁট একটু পুরু। ঠোঁট দুটির মধ্য হইতে, উপরকার দাঁতের সারির মাঝের কয়েকটি দাঁত একটু বাহির হইয়া রহিয়াছে। গায়ে জামা ছিল; তাহার আস্তিনটা কনুই ও কব্জির মাঝ বরাবর আসিয়াছে। খানিকক্ষণ পরে, জামা খুলিয়া পাশে রাখিয়া দিল এবং কোঁচার কাপড়টি লম্বা করিয়া বাঁ কাঁধে দিল। ঘরটি বেশ গরম হইয়াছিল। একজন লোক বড় এড়ানী পাখা অর্থাৎ বড় পাখা লইয়া পিছন দিক হইতে বাতাস করিতে লাগিল। কথাবার্তার ভাষা কলিকাতার শিক্ষিত সমাজের ভাষার মতো নয়, অতি গ্রাম্য ভাষা, এমন কি, কলিকাতা শহরের রুচিবিগর্হিত। কথাগুলি একটু তোতলার মতো। রাঢ়দেশীয় লোকের মতো উচ্চারণ; ন এর জায়গায় ল উচ্চারণ করিতেছে, যেমন, 'লরেনকে বললুম', ইত্যাদি। সম্মুখে একটি রঙিন বটুয়া রহিয়াছে, তাহার মধ্যে কি মশলা আছে; মাঝে মাঝে একটু মশলা লইয়া মুখে দিতেছে।
আমাদের বয়স তখন অল্প এবং আমরা শিক্ষিত সমাজে পরিবর্ধিত; এইজন্য, ভাষা ও উচ্চারণ শুনিয়া পরমহংস মশাই-এর প্রতি মনে একটি অবজ্ঞার ভাব আসিল - এই লোকটাকে রামদাদা কেন এত সম্মান ও শ্রদ্ধা-ভক্তি করেন? চুপ করিয়া বসিয়া সব দেখিতে লাগিলাম। মনে মনে আবার ভাবিতে লাগিলাম - কেন রামদাদা এই লোকটাকে এত সম্মান করেন; দুর্ধর্ষ সুরেশ মিত্তির এবং বুদ্ধিমান নরেন্দ্রনাথই বা কেন কয়েক বার এর কাছে গেছেন? লোকটার কি ব্যাপার? - দেখিলাম, ঘরে অনেকে বসিয়া আছেন, কিন্তু দুই-একটি বৃদ্ধ একটি বা দুইটি প্রশ্ন করিলেন মাত্র; আর কেহ কিছু কথা কহিলেন না। লোকটি আপনি কথা কহিতেছে ও মাঝে মাঝে শ্যামা-বিষয়ক গান গাহিতেছে; কখনো বা বৈষ্ণবদিগের গানও গাহিতেছে। সকল লোক নীরব হইয়া রহিয়াছে। আর একটি বিষয় দেখিলাম যে সাধারণতঃ, কথকতা শুনিতে যাইলে মনে অন্য এক প্রকার ভাবের উদয় হয় - একটু হাসি-কৌতুকের ভাব থাকে; সাধারণ-সমাজে যাইলে মনটা উসখুস করে এবং একটু গান শুনিবার ইচ্ছা থাকে বা কখন চলিয়া আসিব - এই ভাবনা হয়; ঠিক মন বসে না, যেন আধা-বৈঠকখানা ও আধা-ঠাকুরবাড়ি ভাব। কিন্তু এখানে প্রথম দেখিলাম যে, সেরূপ ভাব আসিল না; অন্য প্রকার একটি ভাব আসিতে লাগিল, ত্রাসও নয়, উদ্বেগও নয়; কিন্তু ইচ্ছা হইল চুপ করিয়া বসিয়া থাকি। কেহই কোনো কথা কহিতেছে না; লোকটি যখন নিজে ইচ্ছা করিয়া কথা কহিতেছে তখনই কথা হইতেছে মাত্র। গ্যাসের বাতি দুটির সোঁ-সোঁ করিয়া আওয়াজ হইতেছে। ঘর একেবারে নিস্তব্ধ, যেন ঘরে একেবারে মানুষ নাই।
খুব স্থির হইয়া দেখিতে লাগিলাম। দেখিলাম লোকটি পাড়াগেঁয়ে অশিক্ষিত; মাঝে মাঝে অসভ্য ভাষায় কথা কহিতেছে। কিন্তু লোকটি পাগলও নয়, যে নিতান্ত এলোমেলো ভাব। আফিমখোরের ভাবও নয় যে নিঝুম হইয়া আছে। পাগল হইলে এলোমেলো ভাব হয়, বড় হাত-পা নাড়ে, মাথা নাড়ে; এ লোক সেরূপ নয়। আবার যে বালকের ভাব, সে রকমও তো নয়; কারণ ছোট ছেলেদের ভিতর নিরবচ্ছিন্নতার, অর্থাৎ Continuance-এর ভাবটি থাকে না। আবার যে সাধারণ লোক, তাহাও তো দেখিতেছি না। তীক্ষ্ণবুদ্ধি-সম্পন্ন যে লোক - নানা বিষয়ে বেশ পরামর্শ দিতে পারে, তাহাও তো দেখিতেছি না। তর্ক, যুক্তি ও নানা রকম দার্শনিক মত, যাহা আমরা সর্বদা শুনিতাম, এ ব্যক্তি তো সেরকম কিছু কথা বলিতেছে না। দেখিলাম লোকটি হড়বড় করিয়াও কথা বলিতেছে না বা যাহাকে বলে 'প্রগল্ভ', তাহাও তো নয়! কলিকাতায় যেমন বক্তৃতা শুনিতাম, বক্তা অনর্গল কথা বলিয়া যাইতেছে, এ লোকটি তো তেমনও কিছু বলিতেছে না। পণ্ডিতগিরি ফলানো বা গুরুগিরি করাও তো নাই। - লোকটি যেন তাহার মনটিকে উচ্চ স্তর হইতে নামাইয়া আনিয়া কথা কহিতেছে; আর না হইলে এক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিয়াছে। কেহই তাহার সহিত তর্ক-যুক্তি করিতেছে না। কেহই প্রশ্ন করিতেছে না, বা করিবারও কাহারো ইচ্ছা নাই। লোকটি যা বলিতেছে, তাহাই সকলে স্থির হইয়া শুনিতেছে। সকলেই তাহার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে চাহিয়া আছে যে, সে কখন কি বলিবে।
আর একটি বিষয় দেখিলাম যে, শ্যামা-বিষয়ক বা বৈষ্ণবদিগের গান তো চলিত গান, এ সকল বহুবার শুনিয়াছি, নূতনত্ব কিছুই নাই; কিন্তু এই লোকটি যখন, মাঝে মাঝে, সেই সকল চলিত গানই গাহিতেছে, তখন মনে অন্য এক প্রকার ভাব আসিতেছে, সে যেন অন্য এক ভাবে গানটিকে দেখাইতেছে। মাঝে মাঝে, সে যেন স্থির হইয়া যাইতেছে; আবার, যেন গলা শুকাইয়া যাইতেছে বলিয়া, বটুয়া হইতে একটু একটু মশলা লইয়া মুখে দিতেছে। কথাবার্তা যাহা বলিতেছে, তাহা মনে রাখা যাইতেছে না। কিন্তু কথাগুলি যে ঠিক, সত্য - এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই হইতেছে না। তর্ক করিবার ইচ্ছা হইতেছে না, কথাগুলি যে নিশ্চিত ও নির্দ্বন্দ্ব - এই ভাবটি যেন ভিতরে আসিতেছে। শব্দ ও ভাব এত তাড়াতাড়ি আসিতেছে যে, কথাগুলি মনে রাখিবার সুবিধা হইতেছে না এবং সময়ও পাওয়া যাইতেছে না। কথাগুলি শুনিবার বিষয়; কিন্তু তাহার অর্থ জানি না, তাৎপর্যও কিছু বুঝি না।
সকলেই যেন এক প্রকার ভাবে অভিভূত হইয়া পড়িল। বেশ একটু ঘোরপানা আচ্ছন্ন ভাব আসিতে লাগিল। অন্য কোনো বিষয়: ক্ষুধা পাইয়াছে; তৃষ্ণা পাইয়াছে, জলপান করিব; বা অধিক রাত্রি হইয়াছে, বাড়ি ফিরিয়া যাইব - এ সকল কোনো চিন্তাই মনে আসিতেছিল না। সকলে স্থির ও নিঝুম হইয়া বসিয়া রহিল। খানিকক্ষণ পরে দেখি যে, লোকটি কথা কহিতে কহিতে স্থির হইয়া গেল। ডান হাতের মাঝের আঙুল তিনটি বাঁকিয়া গেল। হাত দুটি সিধা ও শক্ত হইয়া গেল। মিরগি হওয়া আমরা ঢের দেখিয়াছি, কিন্তু এ তো তা নয়। আমরা সকলে তাহার মুখের দিকে এক দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলাম। মিরগি হইলে, মুখে চোখে জল দিতে হয়, বাতাস করিতে হয়; একে তো সেরূপ করিতে হইতেছে না। এই নূতন ব্যাপার দেখিয়া আমরা কিছুই বুঝিতে পারিতেছিলাম না। এই মাত্র বিশেষভাবে বুঝিলাম যে, মনটাকে উপর হইতে নামাইয়া আনিয়া লোকটি কথা কহিতেছে, এবং আমাদের মনকে যেন আঠা দিয়া জুড়িয়া উপর দিকে লইয়া যাইতেছে। দেখিলাম যে, লোকটির প্রতি একটা টান আসিল। এ টান - ভালবাসা বা স্নেহ-মমতা নয়। কারণ, এগুলি নিম্ন স্তরের লোকের প্রতি হয়। শ্রদ্ধা-ভক্তিও নয়; তাহা হইলে উচ্চ-নীচ জ্ঞান থাকে ও ভয় থাকে। এ টান ভিতরের; লোকটির কাছে থাকিতেই ভাল লাগিতেছে।
আমাদের বাড়ি তখন বড়মানুষের বাড়ি, পাড়ার সকল লোকের বসিবার জায়গা। এইজন্য, আমরা বহু প্রকার লোক দেখিতে পাইতাম; বহু প্রকার লোকের সঙ্গে আমরা মিশিতাম। কিন্তু দেখিলাম যে, এই লোকটিকে কোনো বিশেষ থাকের বা শ্রেণীর ভিতর ফেলা যাইতেছে না। সকল শ্রেণীর হইতে পৃথক, অথচ যেন কিছু সম্পর্ক আছে। আমাদের তখন বয়স অল্প; এইজন্য, প্রথমটায় সব গোল হইয়া গিয়াছিল।
আমরা যখন ছাদে খাইতে যাইলাম, তখন দেখিলাম যে ব্রাহ্মণ-কায়স্থ সকলেই একসঙ্গে বসিয়া খাইতেছে; অন্য পাড়ার দু-পাঁচ জন লোকও তাহার ভিতর আছেন। অবশ্য, নিরামিষ রান্না - লুচি-তরকারি ইত্যাদি হইয়াছিল। তখনকার দিনে সকল জাতের সঙ্গে একত্র খাওয়ার প্রথা ছিল না। তখন বাড়িতে যাইয়া নিমন্ত্রণ করিয়া আসিবার প্রথা ছিল; কিন্তু দেখিলাম যে, এখানে সকলে অ-নিমন্ত্রিতভাবে খাইতেছেন। 'ইয়ার' লইয়া হাসি-তামাসা করিয়া যে খাওয়া, তাহা নয়। যজ্ঞিবাড়ির যে খাওয়া, তাহাও নয়। যজ্ঞিবাড়িতে খাইলে অনেক সময় একটা বেগারঠেলার খাওয়ার ভাব থাকে। যজ্ঞিবাড়ির বেগারঠেলার খাওয়াতে ও এ খাওয়াতে অনেক তফাৎ বোধ হইল। এখানে যেন সকলেই শ্রদ্ধা-ভক্তি করিয়া খাইতেছেন, কেহই অবজ্ঞার ভাবে খাইতেছেন না। যে সকল লোক একসঙ্গে খাইতেছিলেন, তাঁহাদের পরস্পরের ভিতর একটি টান দেখা গেল; যেন নিজের লোক বলিয়া একটি ভাব আসিল।
আহারাদি করিয়া আমরা সকলে নীচে নামিয়া আসিলাম। পরমহংস মশাই, রাত্রি আন্দাজ এগারোটার সময়, গাড়ি করিয়া চলিয়া গেলেন। আমরাও চলিয়া আসিলাম। দেখিলাম, প্রায় তিন দিন কি রকম একটি ঘোর ঘোর নেশা রহিল। যেমন সকলে সাধারণ কাজ করিয়া থাকে, তাহাও করিতেছি, কিন্তু মনটা যেন পৃথক হইয়া রহিয়াছে, সব জিনিসের সহিত মাখামাখি হইয়া থাকিতেছে না, মনটা যেন সব জিনিস হইতে তফাৎ থাকিতেছে, বেশি মেশামেশি করিতে চাহিতেছে না। পরমহংস মশাই চলিয়া গেলেন, কিন্তু তাঁহার প্রতি ভিতর হইতে একটি টান রহিয়া গেল; সেটা যে অন্য প্রকারের জিনিস, তাহা আমরা বেশ বুঝিতে পারিলাম। এই হইল প্রথম দিনকার দর্শনের কথা।
1. শ্রীযুত দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার।↩
No comments:
Post a Comment