Thursday, May 31, 2018

আকর্ষণী শক্তি

নীচুকার বৈঠকখানায় বসিয়া থাকিবার সময় হউক, উঠানে কীর্তন করিবার সময় হউক, বা খাওয়ার সময়ই হউক পরমহংস মশাই-এর একটি অদ্ভুত আকর্ষণী শক্তি দেখিতে পাইতাম। পরমহংস মশাইকে স্থির হইয়া দেখা - ইহাই যেন আমাদের প্রধান কাজ ছিল। তাঁহার কথাবার্তা অনেক সময় আমাদের মনে থাকিত না। দেখিতাম এই তো সামান্য একজন পাড়াগেঁয়ে লোক আর আমরা কলিকাতার শিক্ষিত লোক সেই পাড়াগেঁয়ে লোকের কাছে বসিয়া আছি। আমাদের অনেকের মনে এরূপ ভাবও ছিল যে, আমরা কলিকাতার শিক্ষিত বড়ঘরের ছেলে কেবল রামডাক্তারের খাতিরে বা তাঁহাকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য তাঁহার গুরু - এই সামান্য লোকটাকে দেখিতে আসিয়াছি। কিন্তু দেখিতাম যে, পরমহংস মশাই-এর শরীর হইতে কি একটি আভা (Effluvium) বা শক্তি বাহির হইত। শক্তি বা আভা কেন্দ্র হইতে বাহির হইয়া সমস্ত ঘরটি ভরিয়া ফেলিত, তাহার পর সম্মুখের দালানটি ভরিয়া দিত। এমন কি সেই আভা বা শক্তি জানালার গরাদের মধ্য দিয়া বাহির হইয়া গিয়া রাস্তায় যেন ঢেউ খেলিত। আমি অনেক সময় এইটি দেখিতে পাইতাম। সেই সময়কার অনেকেই ইহা বিশেষ করিয়া দেখিয়াছেন এবং এ বিষয়ে কথাবার্তাও হইত। প্রথম যেন কি একটি শক্তি বা আভা আসিয়া ত্বক স্পর্শ করিত। ক্রমে সেই শক্তিটি মাংসের ভিতর ঢুকিতে শুরু করিত এবং তাহার পর ধীরে ধীরে, হৃদয়ের কাছে আসিতে থাকিত, ইহা বেশ অনুভব করা যাইত। তখন নিজের অন্তরস্থিত শক্তি বা ব্যক্তিত্বের সহিত বাহ্যিক এই শক্তির প্রবল দ্বন্দ্ব চলিত। অবশেষে বাহ্যিক শক্তি অভ্যন্তরীণ শক্তিকে পরাভূত করিয়া ভিতরে প্রবেশ করিত; তাহার পর ব্যক্তিত্ব বা নিজের কোনো একটি শক্তি বা ক্ষমতা - এ সব কিছুই থাকিত না। কী যেন একটি শক্তিতে আচ্ছন্ন হইয়া যাইতাম! নিজের স্বাভাবিক যে সকল চিন্তা, ঘর-বাড়ির চিন্তা - এই সকল কিছুই থাকিত না। মন যেন কোথায় চলিয়া যাইত। দেহ ছাড়িয়া মনটা বা ভিতরটা যেন অন্য এক রাজ্যে চলিয়া যাইত। কাহারই বা দেহ, কাহারই বা মন; কাহারই বা বাসনা, কাহারই বা সংকল্প! জগৎ ও জগতের ক্রিয়াসমূহ দূরে পড়িয়া রহিয়াছে - একটা ছবির মতো। জগতের জন্য আকাঙ্ক্ষা, মায়া-মমতা কিছুই নাই; এমন কি নিজের হাত-পা দেহ যে আছে সে বোধও থাকিত না। বিদেহ বা অশরীরী অবস্থা যেন হইয়া যাইত। চিন্তা, বাসনা ও তর্ক-যুক্তি অতি তুচ্ছ বলিয়া বোধ হইত। এমন কি জপ-ধ্যানও যাহাকে ভগবৎ-লাভ বা সত্যলাভের অতি শ্রেষ্ঠ উপায় বলা হইয়া থাকে, তাহাও বন্ধন বলিয়া মনে হইত। শ্রদ্ধেয় নাগ মশাই1 একবার বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী মশাইকে বলিয়াছিলেন, "এখানে2 এসেছ, চোখ বুজে বসে আছ কেন? দেখতে এসেছ, চোখ খুলে দেখ।" কথাটি অতি সত্য। জপ-ধ্যানও সেখানে বন্ধন বা অন্তরায় হইয়া যাইত। এইরূপ অশরীরী ভাব সকলের ভিতর তিন দিন পর্যন্ত থাকিত; ঠিক হিসাব মতো বলিলে, আড়াই দিন থাকিত। জগৎটাকে যেন দেখা যাইতেছে - পূর্বের ঘর-দুয়ার ইত্যাদি সব-কিছুই, কিন্তু অ-সংলগ্নভাবে। যাহা করিবার হাত-পায়ে তাহা করা যাইতেছে, কাজে কোন ভুল হইতেছে না, কিন্তু মনটা যেন অন্য স্তরে চলিয়া গিয়াছে। তাহার পর ধীরে ধীরে, এই শক্তিটি চলিয়া যাইত এবং স্বাভাবিক অবস্থায় আসিয়া যে-যাহার কাজ করিত।

একটি বিষয় বিশেষ উল্লেখযোগ্য যে, এক জন আর এক জনের গায়ের উপর কি যেন একটি আভা রহিয়াছে দেখিতে পাইত। এই আভা থাকার দরুন পরস্পরের মধ্যে একটি অদ্ভুত আকর্ষণী শক্তি আসিয়াছিল। ইহা ভালবাসা নয়; ভালবাসা ইহার কাছে অতি তুচ্ছ জিনিস। পরমহংস মশাই-এর প্রতি যেমন একটি আন্তরিক আকর্ষণ হইয়াছিল, পরস্পরের প্রতিও সেইরূপ আকর্ষণ হইয়াছিল। এইজন্য, পরমহংস মশাই-এর একটি আত্মগোষ্ঠী গড়িয়া উঠিয়াছিল; আর, এইজন্যই বাহিরের লোকেরা তাঁহার কাছে যাইতে তত ইচ্ছা করিত না। পরস্পরের সহিত না দেখা হইলে বড় কষ্ট বোধ হইত। দুই-তিন জন একসঙ্গে বসিয়া পরমহংস মশাই-এর সম্বন্ধে কথাবার্তা কহাই বড় আনন্দের বিষয় ছিল। রাস্তায় পরস্পরে দেখা হইলেই পরমহংস মশাই-এর কথাই হইত; সংসারের কথাবার্তা হইত না! অফিস হইতে আসিয়া মুখ-হাত-পা না ধুইয়াই দুই-তিন জনে বসিয়া বিভোর হইয়া পরমহংস মশাই-এর বিষয় কথাবার্তা কহিত। অন্য কোনো কথা, সামাজিকতা বা পূর্ব বন্ধুদিগের সহিত মেলামেশা - এ সব আর ভাল লাগিত না। নিজেরা যেন অন্য এক রাজ্যের লোক। বাহিরের জগতের দিকে মন রাখিবার আর কাহারো ক্ষমতা রহিল না। পরস্পরে বসিয়া যে কথাবার্তা হইত তাহার অন্য কিছু উদ্দেশ্য আছে বলিয়া কেহই জানিত না; কেবল পরমহংস মশাই-এর সম্বন্ধে কথাবার্তা কহাই উদ্দেশ্য। এইরূপ কথাবার্তা কহিতে কহিতে রাত্রি অধিক হইয়া যাইত; কিন্তু একে অপরকে ছাড়িতে পারিত না। রাত্রিতে একজন অপরকে বাড়ি পৌঁছাইয়া দিতে যাইত, আবার সে ব্যক্তি নিজ বাড়ির দরজা হইতে ফিরিয়া তাহাকে পৌঁছাইয়া দিতে আসিত। এইরূপ অধিক রাত্রি বা প্রায় সমস্ত রাত্রি পর্যন্ত উভয়ে পায়চারি করিত; কেহ কাহাকেও ছাড়িয়া যাইতে পারিত না। প্রত্যেক লোক বোধ করিত যে, পরমহংস-মশাই-মিশ্রিত-আঠা লাগানো রহিয়াছে বলিয়া কেহ কাহাকেও ছাড়িয়া যাইতে পারিতেছে না। এ বিষয় কাহারো সন্দেহ করিবার কিছুই নাই; ইহা আমরা স্পষ্ট অনুভব করিয়াছি।

এইরূপ আচ্ছন্নভাবে থাকিতে কাজ-কর্মের কোনো ব্যাঘাত হইত না, বরং অল্প সময়ের মধ্যে নির্ভুল কাজ হইত। ইহাকে উদ্ভ্রান্ত হওয়া বলা যায় না; অজ্ঞাতসারে ভাব-সমাধি হওয়া বলা যায়। জপ-ধ্যান করিয়া যেরূপ উচ্চ অবস্থায় উঠা যায়, অজ্ঞাতসারে তাহাই হইত। পরমহংস মশাই যে কিরূপ ও কত দূর তাঁহার সূক্ষ্ম বা কারণ শরীর বিকিরণ করিতে পারিতেন, ইহা তাহারই নিদর্শন। অবশ্য ইহা জানিতে হইবে যে সব সময় তিনি নিজ দেহ হইতে এই শক্তি বাহির করিতেন না। কারণ অধিকাংশ সময়েই তিনি সাধারণ লোকের মতো সাধারণভাবেই থাকিতেন; সাধারণ লোক হইতে মাত্র কিছু তফাৎ এই যা। কিন্তু তিনি নিজে যখন উচ্চ স্তরে উঠিতেন এবং যখন তিনি ইচ্ছা করিতেন তখন তাঁহার দেহ হইতে এই আভা বা শক্তি বাহির হইত।

বৌদ্ধ গ্রন্থে এইরূপ উচ্চ অবস্থায় অবস্থিতিকে, আনন্দময় লোকে অবস্থান বলা হইয়াছে; ইহা ভাবলোক ও জ্ঞানলোকে অবস্থানের বহু ঊর্ধ্বে বা উচ্চে। এই অবস্থাটি পাওয়া অতীব দুর্লভ। বোধ হয় সাধারণ লোক নিজের চেষ্টায় এই অবস্থা জীবনে দু-চার বার পাইতে পারে মাত্র। কিন্তু পরমহংস মশাই-এর শরীর হইতে যখন এই শক্তি বাহির হইত তখন সকলে অযাচিতভাবে এই অতীব দুর্লভ অবস্থা লাভ করিত। নরেন্দ্রনাথ যখন দক্ষিণেশ্বরে প্রথম গিয়াছিল, তখন পরমহংস মশাই হঠাৎ এই শক্তি নরেন্দ্রনাথের উপর প্রক্ষেপ করিয়া ছিলেন। নরেন্দ্রনাথের ভিতরটা তখন দেহ ছাড়িয়া যেন কোথায় উঠিয়া যাইতে লাগিল। রামদাদার বাড়িতে পরমহংস মশাই-এর এই ভাব বিকাশ বা শক্তি বিকাশ, যাহাকে বলে চকিতের ভিতর বিদেহ বা অশরীরী করিয়া দেওয়া, অনেক সময় অনুভব করিতাম। পরমহংস মশাইকে দেখিয়াছেন এমন লোক যদি আজও জীবিত থাকেন তো তাঁহারা এ বিষয়টি স্মরণ করিতে ও অনুভব করিতে পারিবেন।

স্যামুএল বিল-এর গ্রন্থে আছে যে, এক দিন প্রাতঃকালে গৌতম রাজগৃহে যাইয়া পথে ভিক্ষা করিতে লাগিলেন। গৌতমকে দেখিয়া আশ-পাশের লোকজন সকলেই অবাক হইয়া গেল; তাহারা নিজ নিজ কাজ-কর্ম ভুলিয়া গিয়া পরস্পর পরস্পরের প্রতি চাওয়া চাহি করিতে লাগিল। দাঁড়িপাল্লা লইয়া যাহারা জিনিস বিক্রয় করিতেছিল, পাল্লাটি তাহাদের হাতেই স্থির হইয়া রহিল; যাহারা পয়সা গণিয়া লইতেছিল, পয়সা তাহাদের হাতেই রহিয়া গেল; যাহারা মদ্যপান করিতেছিল, তাহাদের পাত্র হাতেই অচল হইয়া রহিল। স্ত্রীলোকেরা দরজার ফাঁক দিয়া, জানালা হইতে উঁকি মারিয়া, কেহ বা বারাণ্ডা হইতে, কেহ বা ছাদ হইতে এই অজ্ঞাত লোকটির দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো চাহিয়া রহিল; কেহ কেহ বলিতে লাগিল ইনি নিশ্চয় দেবরাজ। কেহ বলিল, ইনি শত্রু, নরকায় ধারণ করিয়া পৃথ্বীতলে ভ্রমণ করিতেছেন; কেহ কেহ বা - সূর্যদেব, চন্দ্রদেব ইত্যাদি আখ্যা দিল। ওদিকে রাজা সেনিয় বিম্বিসার3 তোরণ হইতে অনিমেষ নেত্রে যুবা সন্ন্যাসীকে দেখিতে দেখিতে মনে নানা চিন্তা করিতে লাগিলেন।

এই যেমন একটি আকর্ষণী শক্তির উপাখ্যান আছে, পরমহংস মশাইকে আমরাও ঠিক এইরূপ দেখিয়াছিলাম। গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, বুদ্ধ, চৈতন্য প্রভৃতি মহাপুরুষদিগের এইরূপ আকর্ষণী শক্তি ছিল। একটি উক্তি আছে: There is a divinity that hedges round a saint, অর্থাৎ সিদ্ধ মহাপুরুষদিগকে একটি দেবশক্তি আবরিত করিয়া রাখে। অপর মহাপুরুষগণের বিষয় গ্রন্থে পড়িয়াছি মাত্র, কিন্তু পরমহংস মশাই-এর জীবনে ইহা আমরা প্রত্যক্ষ করিয়াছি। দু-একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করিতেছি।

তখনকার দিনে এত ডাক্তারখানা ছিল না। শিমলা অঞ্চলে 'বাঘওয়ালা ডাক্তারখানা'-ই4 এক প্রধান ডাক্তারখানা ছিল। এক ব্যক্তির বাইশ বৎসরের একটি ছেলের টাইফয়েড অসুখ করিয়াছিল। টাইফয়েড রোগে তখন লোকে বড়-একটা বাঁচিত না; লোকটি প্রেসক্রিপসন লইয়া, হন্তদন্ত হইয়া, ডাক্তারখানায় ওষুধ আনিতে যাইতেছিল। লোকটিকে দেখিতে কালোপানা; দোহারা, লম্বা-চওড়া চেহারা; বয়স, পঁয়তাল্লিশ কি পঞ্চাশ হইবে। লোকটি আমাদের পাড়ার নয়। আমরা তাহাকে চিনিতাম, কিন্তু তাহার সহিত আমাদের আলাপ-পরিচয় ছিল না। বোধ হয় তাহার বাড়ি ছিল জোড়াসাঁকো অঞ্চলে। সড়ক দিয়া যাইলে ওষুধ আনিতে অনেক দেরি হইবে সেইজন্য সে সিংহীদের পুকুর-পাড় দিয়া, রামদাদার বাড়ির সম্মুখের গলি দিয়া তাড়াতাড়ি যাইতেছিল। রামদাদার বাড়ির দরজায় আসিয়া সে দেখিল যে, রাস্তায় বেঞ্চি পাতিয়া অনেক ভদ্রলোক বসিয়া আছেন, যেন বাড়িতে লোকজন খাওয়ানো হইবে। ব্যস্ত-সমস্ত হইয়া লোকটি জিজ্ঞাসা করিল, "আজ এখানে কি গো?" উপস্থিত এক জন বলিলেন, "এখানে দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস মশাই এসেছেন।" লোকটি বলিল, "কোনটি?" তখন তাহাকে বলা হইল যে, গালিচার উপর যিনি বসিয়া আছেন তিনিই হইতেছেন দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস মশাই। লোকটি রাস্তা হইতে জানালার গরাদের ভিতর দিয়া খানিকক্ষণ উঁকি মারিয়া দেখিল। ঠিক সেই সময় পরমহংস মশাই-এর গা হইতে আকর্ষণী শক্তি বাহির হওয়াতে যেমনই তাহা অচেনা লোকটির গায়ে লাগিল, অমনি সে অভিভূত হইয়া পড়িল। ভিতরে বসিবার আর জায়গা ছিল না, কাজেই, সেই লোকটি বাহিরে বসিয়া রহিল। তাহার পর সকলে যখন তেতলায় খাইতে গেল সেও দ্বিধা না করিয়া খাইতে গেল। আহার করিয়া সকলে নামিয়া আসিল। রাত্রে যখন পরমহংস মশাই ফিরিয়া গেলেন এবং সকলে যে যার বাড়িতে যাইতে লাগিল, তখন তাহার হুঁশ হইল যে, রাত্রি এগারোটা সাড়ে-এগারোটা বাজিয়া গিয়াছে, তাহাকে ওষুধ আনিতে যাইতে হইবে, ডাক্তারখানা হয়তো বন্ধ হইয়া গিয়াছে, বাড়ির লোকেরাই বা কি ভাবিবে!

পাড়ার একটি যুবক মদ-ভাঙ খাইয়া বেড়াইত। সে ওভারসীয়ার-এর কাজ করিত। নগদ টাকা যাহা পাইত তাহাতে সে মদ খাইত। রামদাদা এক দিন তাহাকে বলিয়াছিলেন, "আরে, তুই তো মদ খেয়ে বেড়াস, তোর চাট জোটে কি?" সে মাতাল লোক সরলপ্রাণে বলিল, "রামদাদা, বলতে কি চাটের পয়সা জোটে না, শুধু মদ খেয়ে বেড়াই।" রামদাদা উপহাসের ছলে তাহাকে বলিলেন, "তুই আজ সন্ধ্যের সময় আসিস। তোকে লুচি-আলুর দমের চাট খাওয়াবো।" মাতাল এই শুনিয়া তো ভারি খুশি। কাছেই তাহার বাড়ি। সন্ধ্যার সময় আসিয়া বাহিরের বেঞ্চির কাছটিতে বসিয়া রহিল এবং খাতিরে, ঘরের ভিতর গিয়া পরমহংস মশাইকে একটা প্রণামও করিয়া আসিল; আর ক্রমাগত বকিতে লাগিল, "লুচি আলুর দমের চাট কখন দেবে? লুচি আলুর দমের চাট কখন দেবে?" তাহার পর সকলের সঙ্গে সেও উপরে গিয়া খাইয়া আসিল। কিন্তু, সে এমন চাট খাইয়া আসিল যে, চিরজীবনের মত চাট খাইল! সে যে সময় আসিয়াছিল, সেই সময় পরমহংস মশাই-এর দেহ হইতে আকর্ষণী শক্তিটি বাহির হইয়াছিল। শক্তিটি তাহাকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। পরে সে ক্রমাগত খবর লইত "পরমহংস মশাই আবার কবে আসবেন?" যদিও তাহার মদ খাওয়ার অভ্যাসটা কিছু দিন রহিল, কিন্তু ধীরে ধীরে তাহার ভিতরটা বদলাইয়া যাইতে লাগিল।

এই লোকটি নাগপুরে পরে চাকরি করিতে গিয়াছিল। কয়েক বৎসর সে শিমলায় ছিল না। এক বার নাগপুর হইতে ফিরিয়া আসিয়া সে দেখিল যে, পাড়ায় পুরানো লোক আর বড় কেহ নাই, অনেকেই মারা গিয়াছে। সে তাহার আত্মীয়দের সহিত দেখা করিয়া আসিয়া সকাল বিকাল আমার কাছে বসিয়া থাকিত আর বলিত, "ভাই, তাঁর কথা বল, আর জগতে কিছু ভাল লাগে না। আমি মাতাল লোক ছিলুম, লুচি আলুরদমের চাট খেতে গিয়েছিলুম; কিন্তু তিনি কী করে দিলেন? তাঁকে ছাড়া আর কিছু মনে আসে না! হায়, এমন অমূল্য রতন হাতে পেয়ে তখন কিছু বুঝি নি, লুচি আলুর দমই শ্রেষ্ঠ মনে করেছিলুম!"

এই লোকটির নাম বিহারী ঘোষ। পরে সে নাকি নাগপুরে একটি ঠাকুরঘর করিয়াছিল।


1. শ্রীযুত দুর্গাচরণ নাগ।

2. শ্রীরামকৃষ্ণ সমীপে।

3. 'বিম্বিসার' পালি সাহিত্যে - 'সেনিয় বিম্বিসার', এবং জৈন আগম গ্রন্থে - 'সেনিয়' (শ্রেণিক) অথবা 'ভিম্ভসার' (= বিম্বসার) নামে সুপরিচিত। অশ্বঘোষের 'বুদ্ধচরিত'-এ তিনি 'শ্রেণ্য বিম্বিসার' নামে অভিহিত হইয়াছেন। তাঁহার শ্বেত পতাকা ছিল বলিয়া পালি 'থেরগাথা' নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থে তিনি 'পণ্ডরকেতু' (= পাণ্ডরকেতু শ্বেতকেতু) আখ্যায় ভূষিত হইয়াছেন।
পালি অর্থকথাকারগণের মতে - (১) 'সেনিয়' বিম্বিসারের খ্যাতি মাত্র; (২) বিম্বিসার সেনিয়-গোত্রীয়; অথবা (৩) তাঁহার বৃহৎ সৈন্যবল ছিল বলিয়া তাঁহাকে সেনিয় আখ্যা প্রদত্ত হয়। কিন্তু সংস্কৃত শ্রেণ্য বা 'শ্রেণিক' পদ হইতে এরূপ কোনো কল্পনা সিদ্ধ হয় না।
বিম্বিসার নামের ব্যুৎপত্তি সম্বন্ধেও চারি প্রকার মত বৌদ্ধ সাহিত্যে দৃষ্ট হয়: (১) 'বিম্বি' অর্থে সোনা, এবং তাঁহার দেহকান্তি সোনার ন্যায় দীপ্তিমান ছিল বলিয়া তাঁহার নাম হয় বিম্বিসার; (২) মাতার নাম 'বিম্বী', এবং বিম্বীর সার বা হৃদয়ের ধন বলিয়া তাঁহার নামকরণ হয় বিম্বিসার, অথচ তাঁহার পূর্ব ব্যক্তিগত নাম ছিল 'মহাপদ্ম' (রকহিল প্রণীত 'লাইফ অভ্ দি বুদ্ধ' দ্রঃ); (৩) তিনি দেখিতে 'বিম্ব' বা উদীয়মান সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান ছিলেন, ইহাই তাঁহার বিম্বিসার নামের বিশেষত্ব; এবং (৪) বিম্বিসার একটি অর্থহীন ব্যক্তিগত নাম মাত্র।
অমরকোষের মতে, 'বিম্ব' শব্দে সূর্যের দেহ অথবা চন্দ্রের দেহ বুঝায়। বিম্বিসার নামের পূর্বোক্ত তৃতীয় ব্যুৎপত্তি গ্রহণ করিলে, বিম্বিসারের পরিবর্তে বিম্বসার নামই সার্থক হয়। এক্ষেত্রে ইহাও উল্লেখযোগ্য যে, রাজেন্দ্রলাল মিত্র সম্পাদিত 'ললিত-বিস্তর' গ্রন্থে বিম্বিসার এবং বিম্বসার - উভয়বিধ পাঠই পাওয়া যায়। বলা অনাবশ্যক যে, জৈন ভিম্বসার আখ্যা বিম্বসার নামেরই পরিপোষক। জৈন ভাষ্যকারগণের মতে, 'ভাসস্ত দীপ্যমান' অর্থে ভিম্ভসার।


4. এই ডাক্তারখানায় একটি পূরিত ব্যাঘ্র (Stuffed tiger) থাকিত এইজন্য সাধারণে ইহাকে বাঘওয়ালা ডাক্তারখানা বলিত।

Sunday, May 27, 2018

ভাগবত-কথা প্রসঙ্গে

রামদাদার বাড়িতে কয়েক মাস ভাগবত পাঠ হইয়াছিল। রামদাদা ভাগবত কথা সাঙ্গের পর, একদিন উৎসব করিয়াছিলেন। সময়টা বোধ হয় বর্ষার শেষে এক শনিবারে। প্রথম অবস্থায় রামদাদার মাহিনা অল্প ছিল। এই উৎসবের সময় রামদাদার দুই শত টাকা মাহিনা হইয়াছিল। উৎসবে বেশ লোক হইয়াছিল। পরমহংস মশাই বেলা সাড়ে তিনটা কি চারটার সময় রামদাদার বাড়িতে আসিলেন। তিনি দক্ষিণ দিকের উঠানটির পূর্ব দিকের ছোট দালানটিতে গালিচার উপর বসিলেন। উঠানে জাজিম পাতিয়া দেওয়া হইয়াছিল। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী মশাই আসিয়া জাজিমের উপর বসিলেন। তাঁহার পরনে সাদা ধুতি; গায়ে একটি সাদা পিরান ও একখানি উড়ুনি। তখন তাঁহার জোয়ান বয়স, চল্লিশ কি বেয়াল্লিশ বৎসর হইবে। তিনি তখন নব বিধান হইতে সাধারণ সমাজে চলিয়া আসিয়াছেন। সুরেশ মিত্তির অফিস হইতে তাড়াতাড়ি আসিয়া পরমহংস মশাইকে দেখিতে আসিলেন। পরমহংস মশাই ও গোস্বামী মশাই নানা প্রকার কথা কহিতে লাগিলেন। কি কথা হইয়াছিল, আমার কিছুই স্মরণ নাই। তবে এইমাত্র স্মৃতি আছে যে, সকলেই যেন মন্ত্রমুগ্ধ হইয়া পরমহংস মশাই-এর কথা শুনিতে লাগিলেন। তর্কবিতর্ক বা বাদানুবাদ কিছুই ছিল না; সকলেই একমনে তাঁহার কথা শুনিতে লাগিলেন। দেখিলাম যে, কী একটি শক্তি আসিয়া সকলকে অভিভূত করিয়া অন্যত্র লইয়া যাইতে লাগিল।

আমি বার বার এই কথাই বলিতেছি যে, পরমহংস মশাই-এর কথাবার্তা অপেক্ষা তাঁহার ভিতর হইতে যে একটি শক্তি বাহির হইত, তাহা অনেক উচ্চ স্তরের বস্তু। অল্প সময়ের ভিতর, ভাষা, শব্দ, উপস্থিত ব্যক্তি ও স্থান - এই সকল চিন্তা দূর হইয়া যাইত; মনটা যেন অন্য কোথায় চলিয়া যাইত, ঠিক যেন তিনি কেন্দ্র বা বিন্দু এবং শ্রোতৃবর্গ পরিধি। এইজন্য তাঁহার কথাবার্তা তত কিছু মনে থাকিত না, মাত্র একটি আনন্দের স্মৃতি থাকিত। ইহা চাপল্যের ভাব নয় বা উল্লাসের ভাবও নয়; অতি গম্ভীর, স্নিগ্ধ ও প্রাণস্পর্শী একটি ভাব বা শক্তি, যাহা তিনি ইচ্ছামাত্র নিজ দেহ হইতে বিকিরণ করিতে পারিতেন। এই ভাব বা শক্তির তুলনায় আনুষঙ্গিক ব্যাপারসমূহ অতি তুচ্ছ।

দেখিয়াছি যে, সাধারণ অবস্থায় পরমহংস মশাই একটি পাড়াগেঁয়ে অশিক্ষিত ব্যক্তির মতো। কথাবার্তার ভাষা কলিকাতার মতো নয়, পাড়াগেঁয়ে লোকের মতো এমন কি, দূষণীয়। কলিকাতার শিক্ষিত সমাজে বিগর্হিত অনেক শব্দ তিনি ব্যবহার করিতেন এবং তাঁহার আচার-ব্যবহারেও শিক্ষিত সমাজের বিগর্হিত ভাব বিদ্যমান থাকিত। মনে হইত, একটা বোকা-হাবা লোক, জগতের কিছুই বোঝে না। কিন্তু তিনি যখন মনটা উপরে তুলিতেন, তাহার খানিকক্ষণ পরে, তাঁহার মুখের ভাব, কণ্ঠস্বর, অঙ্গভঙ্গী ও চেহারা এমন পরিবর্তিত হইয়া যাইত ও তাঁহার শরীর হইতে এমন একটি শক্তি বাহির হইত যে, বেশ স্পষ্ট অনুভব করা যাইত - সকলে এক অতি মহান পুরুষের কাছে বসিয়া আছি। নিজেদের অপেক্ষা তিনি যে কত উচ্চ স্তরের লোক, তাহা কিছুই নির্ণয় করা যাইত না। তিনি যে ধীশক্তিসম্পন্ন এক অদ্ভুত পণ্ডিত পুরুষ - ইহা নয়; ইহারও উচ্চে - প্রচলিত সকল প্রকার ভাব ও চিন্তার বহু উচ্চে তিনি উঠিতেন; অন্য এক প্রকার লোক তিনি হইয়া যাইতেন। জগৎকে বা সৃষ্টিকে তিনি যে এক নূতন দিক হইতে দেখিতেছেন, এবং যাহা দেখিতেছেন, তাহা যে নিশ্চিত ও দৃঢ়, ইহা বেশ স্পষ্ট বুঝা যাইত। বলা বাহুল্য, তাঁহার চিন্তাশক্তি ও অপরের চিন্তাশক্তির মধ্যে অনেক পার্থক্য ছিল। সাধারণ লোক পুস্তকাদি পড়িয়া থাকে ও তর্ক-যুক্তি ইত্যাদি দিয়া সাধারণভাবে চিন্তা করে এবং কথায় মারপ্যাঁচ করিয়া থাকে। ইহাতে শ্রোতার বা প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরক্তিভাব আসে। ইহাই হইল সাধারণ লোকের কথাবার্তা কহিবার তাৎপর্য। কিন্তু দেখিতাম যে, পরমহংস মশাই অ-চিন্তিতভাবে জগতের ব্যাপারসমূহ অন্য দিক হইতে দেখিতেন, যাহা পূর্বে কাহারো দৃষ্টিগোচর হয় নাই। জগতের নানা সম্পর্ক, চিন্তা, ভাব ও কারণ - এই সকল তিনি নূতন ধরনে দেখিতেন, এবং সেইগুলি তিনি শ্রোতাদের বুঝাইয়া দিতেন! শুধু বুঝাইয়া দিতেন তাহা নয়, স্পষ্ট ধারণা করাইয়া দিতেন, এবং সেগুলি যে সত্য, তাহা বিনা তর্ক-যুক্তিতে প্রমাণ করাইয়া দিতেন, ভাবগুলি ঠিক যেন রূপ ধারণ করিত। সকলে যে এক অতীন্দ্রিয় অবস্থা লাভ করিত ইহা বেশ অনুভব করিতে পারিত। তিনি যেন নিজের শক্তি দিয়া সকলের মনকে ভিতর হইতে কাড়িয়া লইয়া যাইতেন এবং জগৎটাকে এক নূতন দিক হইতে দেখাইতেন। এই ভাবটি আমি সর্বদাই অনুভব করিতাম। এইজন্য কথাবার্তা বা আনুষঙ্গিক বিষয়সমূহে কখনো মন দিতে পারিতাম না। বহু কষ্টে ধ্যান-জপে যে অবস্থা পাওয়া যায় তাহা যেন তাঁহার পক্ষে নিম্ন স্তরের ক্ষেত্র বা স্বাভাবিক অবস্থা ছিল। এইজন্য তিনি সর্বদাই বলিতেন "অখণ্ড সচ্চিদানন্দ"। খণ্ড বা বিচ্ছিন্নভাবে কিছুই নাই, সমস্তই একীভূত।

Thursday, May 24, 2018

পরমহংস মশাই

পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসিলে প্রথমে যেমন জন চল্লিশ লোক হইত এবং রামদাদা তাঁহাকে বাড়িতে লইয়া আসার জন্য সশঙ্ক থাকিতেন, পাছে কেহ তাঁহাকে অবজ্ঞা বা উপহাস করে - ক্রমে ক্রমে সেই ভাব চলিয়া যাইল। পরমহংস মশাইকে সকল লোকে শ্রদ্ধা করুক বা না করুক, তাঁহার প্রতি বিদ্বেষভাব তাহাদের আর রহিল না। লোকসংখ্যা আরো বাড়িতে লাগিল; পঞ্চাশ হইতে এক শ', দেড় শ', এমন কি তিন শ' পর্যন্ত লোক আসিতে লাগিল। ধীরে ধীরে, অনেকেই তাঁহাকে একটু শ্রদ্ধা-ভক্তি করিতে লাগিল, এবং তাঁহাকে 'দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস' বা 'রামডাক্তারের গুরু' না বলিয়া, 'পরমহংস মশাই' বলিতে লাগিল। এমন কি পরমহংস মশাইকে যে ব্যক্তি বিশেষ শ্রদ্ধা-ভক্তি করিত না, তাহার কাছেও যদি কেহ পরমহংস মশাই-এর সম্বন্ধে বিদ্রূপ করিত, তাহা হইলে সে চটিয়া যাইত। ব্রাহ্মণেরা প্রথমে প্রকাশ্যে তাঁহার প্রতি অবজ্ঞাভাব দেখাইতেন; ক্রমে তাঁহারা প্রকাশ্যে আর সেরূপ ভাব দেখাইতেন না; তবে সমাজের ভয়ে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতেন না। কারণ ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ হইয়া তাঁহারা কৈবর্তদের পূজারীর সহিত কিরূপে একত্র বসিবেন ও তাঁহাকে প্রণাম করিবেন। এই ছিল তাঁহাদের মনের ভাব।

পরমহংস মশাই-এর প্রতি পাড়ার সকল লোকের পূর্বকার ভাব চলিয়া গিয়া, বেশ একটি শ্রদ্ধার ভাব আসিতে লাগিল। তিনি যেন পাড়ার লোক, নিজেদের লোক ও সকলের শ্রদ্ধেয়, আর তাঁহার কাছে যাঁহারা যাইতেন, তাঁহারা সকলেই যে স্বগোষ্ঠীর লোক, এই ভাবটিও ধীরে ধীরে আসিতে লাগিল। এই স্বগোষ্ঠীর ভিতর বা আপনা-আপনির ভিতর পরস্পরের বাড়িতে খাওয়া চলিত। জাতাজাতির গোঁড়ামি আপনা-আপনির ভিতর কমিয়া যাইল। গোষ্ঠীর লোকের মধ্যে আর একটি ভাব আসিল - যে ব্যক্তি পরমহংস মশাই-এর কাছে যায়, তাহাকে বিশ্বাস করা যাইতে পারে। অজ্ঞাতসারে একটি সঙ্ঘ গড়িয়া উঠিতে লাগিল। পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসিলে যাঁহারা সর্বদা সেখানে আসিতেন তাঁহারা তাঁহাকে বেশ শ্রদ্ধা-ভক্তি করিতে লাগিলেন। শ্রদ্ধা-ভক্তি যাঁহারা করিতেন না বা কোনো প্রকার চঞ্চলভাবের কথা কহিতেন, তাঁহাদের কাছ হইতে এই গোষ্ঠীর লোকেরা একটু তফাৎ থাকিতে লাগিলেন; এবং যাঁহারা শ্রদ্ধা-ভক্তি করিতেন, তাঁহাদের সহিত বসিয়া কথাবার্তা কহিতেন। পরমহংস মশাইকে যাঁহারা রামদাদার বাড়িতে দেখিতে আসিতেন, তাঁহাদের পরস্পরের মধ্যে বেশ একটি টানও আসিতে লাগিল। এমন একটি টান আসিল যে, পরস্পরকে দেখিতে বা পরমহংস মশাই-এর সম্বন্ধে দুটো কথা কহিতে সকলেই যেন আনন্দ পাইত। স্বগোষ্ঠীর সকলের মধ্যে পরমহংস মশাই-এর বিষয় কথাবার্তা হইত এবং তিনি যে কথা বলিতেন, সেই কথাটির কি অর্থ ও কি তাৎপর্য - এই সকল বিষয় আলোচনা হইত। অপর কোনো কথাই সেই সময় হইত না; বা কেহ অন্য কোন কথা কহিতে পছন্দও করিত না। মোট কথা তাঁহার নাম, তাঁহার প্রসঙ্গ, তাঁহার বাসস্থান, তাঁহার প্রিয় ব্যক্তি - এ সকলই যেন মধুর বলিয়া বোধ হইত। ইহা বিশেষরূপে লক্ষ্য করিতাম যে, পণ্ডিত-মূর্খ, ধনী-দরিদ্র, এ সকল ভাব কিছুই থাকিত না। পরমহংস মশাই এত উচ্চ অবস্থা হইতে কথা কহিতেন যে, পণ্ডিত - মূর্খ হইত, মূর্খ - পণ্ডিত হইত, ধনী - গরিব হইত এবং গরিব - ধনী হইত। এইজন্যই পুনঃপুনঃ বলিতেছি যে, তাঁহার ভিতর হইতে কী একটি শক্তি বাহির হইয়া সকলকে অভিভূত করিয়া ফেলিত, সকলের মধ্যে এক নূতন প্রাণের সৃষ্টি করিত এবং সকলের চিন্তাধারা ও ভাবস্রোত অন্য প্রকার করিয়া দিত; এমন কি, নবীনতা ও প্রবীণতার পার্থক্যবোধও কিছু থাকিত না; যেন অশ্বত্থ গাছ ও দূর্বাঘাস একই হইয়া যাইত।

Wednesday, May 23, 2018

গঙ্গার ঘাটে কেশববাবুর বক্তৃতা

হৃদু মুখুজ্যের1 কাছে এক দিন শুনিয়াছিলাম যে, গরমিকালে, এক দিন শনিবারে কেশববাবু ষ্টীমার করিয়া স-দলবলে দক্ষিণেশ্বরে গিয়াছিলেন। তিনি তো এত জনসমাগম হইয়াছে দেখিয়া, খুব আনন্দিত হইলেন। তাহার পর তিনি অনুনয় করায়, কেশববাবু গঙ্গার ধারে বড় ঘাটটিতে গিয়া, গঙ্গার দিকে মুখ করিয়া, বক্তৃতা দিতে লাগিলেন। হৃদু মুখুজ্যে বলিয়াছিলেন, "কেশববাবুর কী বক্তৃতার ক্ষমতা, মুখ দিয়ে যেন মল্লিকে ফুল বেরুতে লাগলো! অনর্গল তিনি বলতে লাগলেন। কেশববাবু টাউন হলে লিক্চার দিয়ে থাকেন, সে তো কখনো শোনা হয় নি; সেজন্য, কেশববাবুর লিক্চার শোনবার এত আগ্রহ হয়েছিল।"

পরমহংস মশাইও বক্তৃতা শুনিতেছিলেন, কিন্তু খানিকক্ষণ পরেই তিনি বিরক্ত হইয়া নিজের ঘরে চলিয়া যাইলেন। পরমহংস মশাইকে চলিয়া যাইতে দেখিয়া কেশববাবু ভাবিলেন যে তাহা হইলে বোধ হয় বক্তৃতায় কোনো ত্রুটি হইয়াছে। কিন্তু অন্যান্য শ্রোতারা বলিতে লাগিল, "লোকটা অশিক্ষিত; মুক্খু, কোনো-কিছু বোঝে না, তাই চলে গেল।"

কেশববাবু বক্তৃতা শেষ করিয়া পরমহংস মশাই-এর কাছে আসিলেন। সেখানে কথাবার্তা হইতেছে, এমন সময় কেশববাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, "মশাই, কি ত্রুটি হয়েছে?" পরমহংস মশাই বলিলেন, "তুমি বলিলে: ভগবান, তুমি সমীরণ দিয়েছ, তরু-গুল্ম দিয়েছ। - এ সকল তো বিভূতির কথা। এ সব নিয়ে কথা কইবার দরকার কি? যদি এ সব বিভূতি তিনি নাই দিতেন, তা হলেও কি তিনি ভগবান হতেন না? বড়মানুষ হলেই কি তাঁকে বাপ বলবে; যদি তিনি গরিব হতেন, তা হলে কি তাঁকে বাপ বলবে না?" এইরূপ, 'গুণ' ও 'বস্তু'-র কথা, বিভূতি বা ঐশ্বর্যের অতীত হইলেন 'ব্রহ্ম', - এই সকল কথা হইতে লাগিল।

পর দিন রবিবার শিমলাতে এই কথাটি রটিয়া যাইল। তখন এত খবরের কাগজ ছিল না, সকল সংবাদ মুখে মুখে আসিত। বেলা নয়টা হইতে অনেক লোক গৌরমোহন মুখার্জী ষ্ট্রীটে আসিয়া জমা হইতে লাগিল, আর উন্মত্ত হইয়া এই কথা বলাবলি করিতে লাগিল; কারণ এই ভাবের কথা তখন কাহারো জানা ছিল না। আমাদের তখনকার সমস্ত সঞ্চিত জ্ঞান ছিল - কথকের মুখে কিছু কথা শুনিয়া, আর বাইবেলের কথা শুনিয়া; ইহার বাহিরের কিছু কথা আমাদের জানা ছিল না, কেহ ভাবেও নাই। বিভূতি ও ঐশ্বর্যের উপর যে কিছু আছে, তখনকার দিনে এ কথাটি নূতন কথা। অবশ্য কেহই তখনো পর্যন্ত ইহার বিশেষ তাৎপর্য বুঝিতে পারে নাই; তবে সকলেই কেবল বলিতে লাগিল, "বড়মানুষ হলেই কি বাপ হবে, আর গরিব হলে কি বাপ হবে না?" কথাটি নূতন হওয়ায় শিমলাতে লোকের ভিতর এইরূপ উত্তেজনার সৃষ্টি হইয়াছিল। এখনকার দিনে এরূপ কথা খুব বড় কথা নয় কিন্তু তখনকার দিনে, ইহা অতি আশ্চর্যের কথা। আর সেই সঙ্গে একটি কথা উঠিল, "দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস মশাই কেশব সেনের মাথা ভেঙে দিয়েছেন। কেশববাবু আর মাথা তুলে কথা কইতে পারেন না।" বেলা এগারোটা সাড়ে-এগারোটা পর্যন্ত লোকেরা রাস্তায় জটলা করিয়া মত্ত হইয়া এই সকল কথাই বার বার বলাবলি করিতে লাগিল। রবিবারের সকালবেলা বলিয়া জটলা কিছু বেশি হইয়াছিল, বিশ-পঁচিশ জন লোক হইবে। শিমলার লোকেরা কিছু দিন পূর্বে যে ব্যক্তিকে অবজ্ঞা করিত, অশিক্ষিত ও বিকৃতমস্তিষ্ক বলিয়া উপহাস করিত, এখন তাঁহারই এই সব কথা শুনিয়া তাহারা স্তম্ভিত হইয়া গেল। পরমহংস মশাইকে যাহারা উপেক্ষা করিত এবং সামান্য লোক বলিয়া শ্রদ্ধা করিত না, তাহারা সেদিন হইতে পরমহংস মশাই-এর প্রতি নিজেদের মনের ভাবগতিক ফিরাইল। কেশববাবুর যে একচ্ছত্র প্রতিপত্তি ছিল, তাহার কিঞ্চিৎ হ্রাস হইল। এই দিন হইতে পরমহংস মশাই-এর প্রতি শিমলার লোকের একটু বিশেষ শ্রদ্ধা আসিল এবং তিনি একজন বিশিষ্ট লোক বলিয়া পরিগণিত হইতে লাগিলেন।


1. শ্রীযুত হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায়, শ্রীরামকৃষ্ণের ভাগিনেয়।

Monday, May 21, 2018

পরমহংস মশাই-এর প্রভাবে সমাজ

পূর্বে তরকারিতে নুন দেওয়া হইত না। আলুনি তরকারি হইত এবং পাতে পাতে নুন দেওয়া হইত। কিন্তু রামদাদার বাড়িতে নুন দেওয়া তরকারি চলিত এবং সকল শ্রেণীর ও সকল বর্ণের লোকই একসঙ্গে আহার করিত। অপর স্থানে লুচি ও নিরামিষ তরকারি হইলেও সকলে একসঙ্গে আহার করিত না। কিন্তু, রামদাদার বাড়িতে যখন পরমহংস মশাই আসিতেন তখন সকল বর্ণের লোকেই একসঙ্গে আহার করিতে বসিত। তখনকার দিনে এইটি বড় নূতন ব্যাপার; কারণ তখনকার দিনে খাওয়া-দাওয়া একটা বিষম সমস্যার বিষয় ছিল। সামাজিক ব্যাপারে এ সব কিছু চলিত না। এ বিষয়ে পরমহংস মশাই এক বার বলিয়াছিলেন যে, ভক্তের ভিতর জাত নাই; যাহারা ভক্ত তাহারা একসঙ্গে আহার করিতে পারে।

আরো দেখিতাম যে নিমন্ত্রণ না করিলেও অনেকে আসিতেন ও আগ্রহ করিয়া আহার করিয়া যাইতেন; এমন কি, বৃদ্ধ লোকেরাও পরমহংস মশাই আসিবেন শুনিলে, তাঁহাকে দর্শন করিতে আসিয়া আহারও করিয়া যাইতেন। পরমহংস মশাই-এর এমন একটি আকর্ষণী শক্তি ছিল যে, অনিমন্ত্রিত হইয়াও কেহ দ্বিধা না করিয়া সকল লোকের সহিত একসঙ্গে আহার করিত। অন্য প্রকার আহার না করিলেও লুচি-তরকারি খাইত। এইরূপ খাওয়া শিমলাতে তো ছিলই না এমন কি কলিকাতার অন্য কোনো স্থানেও ছিল না। কলিকাতায়, তখনকার দিনে, ইহাতে একটা মহা হই-চই পড়িয়া গিয়াছিল।

এইরূপে ধীরে ধীরে অজ্ঞাতসারে পরমহংস মশাই তাঁহার কাজ করিতে লাগিলেন, কোনো তর্ক-যুক্তি বা হুকুম চালাইয়া নয়, কিন্তু তিনি সকলের মন এত উচ্চ স্তরে তুলিয়া দিতেন যে, সামাজিক বন্ধন, খুঁটিনাটি - এ সব কিছুই মনে থাকিত না। এক অসীম, অনন্ত, মহা উচ্চ স্থানে তিনি মনটাকে তুলিয়া দিতেন যেখানে এরূপ সামাজিক ভাব কিছু থাকিত না; গোঁড়ামির ভাব একেবারেই থাকিত না।

আমরা প্রণাম করার প্রথাকে কু-সংস্কার বলিয়া উঠাইয়া দিয়াছিলাম। আমরা বলিতাম, "ওটা ডৌলের প্রথা, ওটার কোনো আবশ্যক নেই।" পরমহংস মশাই-এর সংস্পর্শে আসিয়া আমরা পরস্পরকে দুই হাত তুলিয়া প্রণাম করিতে শিখিলাম। প্রথম প্রথম প্রকাশ্যে যদিও ঐভাবে প্রণাম করিতে বাধ বাধ ঠেকিত, কিন্তু ধীরে ধীরে আমরা পরস্পরকে প্রণাম করিতে শিখিলাম। পরমহংস মশাই নিজে প্রণাম করিয়া সকলকে প্রণাম করিতে শিখাইলেন। এই বিষয়ে শ্রদ্ধেয় গিরিশবাবুর উপাখ্যানটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গিরিশবাবু এক দিন বৈকালবেলা বাগবাজার বোসপাড়ার গলির মোড়ে রকের উপর বসিয়াছিলেন এমন সময় পরমহংস মশাই গাড়ি করিয়া সেখান দিয়া যাইতেছিলেন। গিরিশবাবু তাঁহাকে দেখিয়া দাঁড়াইয়া উঠিয়া প্রণাম করিবার পূর্বেই পরমহংস মশাই তাঁহাকে প্রণাম করিলেন। গিরিশবাবু আবার প্রণাম করিতে যাইলে পরমহংস মশাই পুনরায় তাঁহার পূর্বে প্রণাম করিলেন। বারংবার এইরূপ করায়, গিরিশবাবু প্রণাম করিতে ক্ষান্ত হইলেন। পরমহংস মশাই কিন্তু নিবৃত্ত না হইয়া, তাহার পরেও গিরিশবাবুকে প্রণাম করিলেন। গিরিশবাবু তখন মনে মনে ভাবিতে লাগিলেন, "দক্ষিণেশ্বরের পাগলা বামুনটার সঙ্গে আর প্রণাম করা চলে না। ওটা পাগলা বামুন, ওর ঘাড় ব্যথা হয় না।"

এই ঘটনাটি উল্লেখ করিবার সময় গিরিশবাবু বলিয়াছিলেন, "রাম অবতারে ধনুর্বাণ নিয়ে জগৎ-জয় হয়েছিল, কৃষ্ণ অবতারে বাঁশির ধ্বনিতে জগৎ-জয় হয়েছিল, কিন্তু রামকৃষ্ণ অবতারে প্রণাম অস্ত্র দিয়ে জগৎ-জয় হবে।"

কথাপ্রসঙ্গে এক স্থানে উল্লেখ করিয়াছি যে, পূর্বে লোক-জন মরিলে সহজে কেহ শবদাহ করিতে যাইত না। সকলেই দরজা বন্ধ করিয়া ঘুমাইত। ডাকিলে কেহ সাড়া দিত না। সে এক বীভৎস ব্যাপার! নরেন্দ্রনাথ এই সময় অনেক শব কাঁধে লইয়া দাহ করিতে গিয়াছিল; কিন্তু সে এই কাজ ঠিক যে পরমহংস মশাই-এর প্রভাবে করিয়াছিল, তাহা বলিতে পারি না। বাবা ইহাতে রাগ করিতেন। কতিপয় সঙ্গী লইয়াও নরেন্দ্রনাথ এইরূপ শবদাহ সমাধা করিত। বলিবামাত্রই, নরেন্দ্রনাথ ও তাহার কতিপয় সঙ্গী ভিন্ন বর্ণের লোকের শব দাহ করিতে যাইত। বিপন্নের সেবা করাই ছিল এইরূপ কাজ করার প্রধান উদ্দেশ্য। এইরূপ সামান্য শুরু হইতেই লোকের ভিতর ভাব বদলাইতে লাগিল। জাতাজাতির কঠোরতা এই সময় হইতেই কিঞ্চিৎ কমিতে লাগিল। নরেন্দ্রনাথ হইল শিমলার এক বড়ঘরের ছেলে, যুবকদিগের অধিনেতা, এইজন্য নরেন্দ্রনাথের উপর কেহ কথা কহিতে বিশেষ সাহস করিত না। এই সকল বিষয় এখন অতি তুচ্ছ বলিয়া বোধ হয়, কিন্তু তখনকার দিনে এই সকল ব্যাপার অতি গুরুতর বলিয়া বিবেচিত হইত।

যাহা হউক, এইরূপ অনেকগুলি নূতন ভাব বা নূতন প্রথা অজ্ঞাতসারে আমাদের ভিতর আসিতে লাগিল। কিন্তু তখনো আমরা প্রচলিত ভাবসমূহের ভিতরেই ছিলাম। এখন ইহা শুনিলে অবশ্য অনেকেই হাসিবেন কিন্তু আমি পুরানো কলিকাতার সমাজের কথা বলিতেছি এবং এখনকার সমাজ কি করিয়া পরমহংস মশাই-এর প্রভাবে পরিবর্তিত হইয়াছে, তাহার কথাই বলিতেছি। পরমহংস মশাই ভালবাসা দিয়া অজ্ঞাতসারে সমাজে এক চেতনা আনিয়া দিয়াছিলেন, তখন ইহা কাহারো চোখে ঠেকে নাই। অপরে তর্ক-যুক্তি ও বক্তৃতা দিয়া যে সকল সামাজিক প্রথা বা আচার-ব্যবহার পরিবর্তন করিতে পারেন নাই, পরমহংস মশাই ধীরে ধীরে, নিজ প্রভাব দিয়া সেই সকল প্রথা বা আচার-ব্যবহার অনেক পরিমাণে পরিবর্তন করিয়াছিলেন, অথচ যাঁহারা গোঁড়া লোক ছিলেন, তাঁহারাও ইহার বিরুদ্ধে কিছু বলিতে পারেন নাই।

Saturday, May 19, 2018

প্রচারকার্যে রামদাদা

পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে মাঝে মাঝে আসিলে, সেখানে সকলে সমবেত হইতেন। অতি প্রথম সময়ে কিরূপ অবস্থা ছিল, তাহা বলিবার জন্য এই সকল সামান্য কথার উল্লেখ করিতেছি। কারণ সাধারণ লোক উৎসবাদি করার জন্য তখন বিদ্রূপ ও উপহাস করিত; কিন্তু এই সকল বিদ্রূপাদি সত্ত্বেও, রামদাদা পরমহংস মশাইকে বাড়িতে আনিয়া উৎসবাদি করিতেন। তিনি অপরের বিদ্রূপ বা অবজ্ঞা - এ সব কিছুতেই দৃকপাত করিতেন না। প্রথম অবস্থায় রামদাদাকে অনেক বাধা-বিঘ্নের ভিতর দিয়া পরমহংস মশাই-এর সহিত মেলামেশা করিতে হইয়াছিল ও তাঁহাকে শিমলাতে আনিতে হইয়াছিল, যাহা করিতে অপর কেহ সাহস করেন নাই। এইজন্য, সকলেই রামদাদার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকিবেন। রামদাদাই নির্ভীক হইয়া প্রথমে এই সকল কাজ করিয়াছিলেন; ক্রমে, অপর সকলে এই সকল কাজে তাঁহার সহিত যোগ দিয়াছিলেন।

রামদাদা সকল আলাপী লোকের বাড়িতে যাইয়া পরমহংস মশাই-এর কথা বলিয়া বেড়াইতে শুরু করিলেন, এবং তাঁহার ভাব ও ক্রিয়াকলাপ সকলকে বুঝাইতে চেষ্টা করিলেন। রামদাদা হইলেন পরমহংস মশাই-এর প্রচারকার্যের এক বিশেষ মুখপাত্র। এমন কি, কথা উঠিয়াছিল, 'রাম যে রকম করে ঢাক পিটিয়ে বেড়াচ্ছে, এ রকম করলে তাঁর দেহ থাকবে না; আর অত উচ্চ জিনিসকে হাটে-বাজারে দিলে লোক নিতে পারবে না।' কিন্তু রামদাদা এ সকল কথায় ভীত না হইয়া সকলকে পরমহংস মশাই-এর কথা বুঝাইবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন এবং মাঝে মাঝে সঙ্গীদের লইয়া দক্ষিণেশ্বরে যাইতে লাগিলেন। প্রথমকালে, রামদাদা পরমহংস মশাই-এর সর্বব্যাপী ভাবটি প্রচার করিবার একজন প্রধান উদ্যোগী ছিলেন।

Friday, May 18, 2018

কেশববাবুর শ্রদ্ধা-ভক্তি

এক দিন রামদাদার সহিত কেশববাবুর সাক্ষাৎ হইয়াছিল। কেশববাবু রামদাদাকে বলিলেন, "ওঁকে 'গ্লাস-কেস'-এর ভেতর রেখে দূর থেকে দেখতে হয়, নাট-ঘাঁট করতে নেই।" - অর্থাৎ পরমহংস মশাই অতি উচ্চ অবস্থার লোক, তাঁহাকে হাটে-ঘাটে লইয়া গিয়া কথাবার্তা কহা ঠিক নয় বা তাঁহাকে লইয়া ঘাঁটাঘাঁটি করা ঠিক নয়। কারণ, সাধারণ লোকে তাঁহার অতি উচ্চ ভাবসকল বুঝিতে পারিবে না, হয়তো বা কেহ কিছু অবজ্ঞা করিবে, আর তাহা হইলে পরমহংস মশাইকে যাঁহারা শ্রদ্ধা-ভক্তি করেন, তাঁহাদের প্রাণে ব্যথা লাগিবে। তিনি এত উচ্চ অবস্থার লোক যে জগতে এ অবস্থার লোক অতি অল্পই আসিয়াছেন। সেইজন্য, তাঁহাকে সার্শির ভিতর রাখিয়া এক আশ্চর্য অদ্ভুত পুরুষ জ্ঞানে দূর হইতে দেখাই ভাল, অতি সসম্ভ্রমে দূর হইতেই তাঁহার কথা শুনিতে হয়।

পরমহংস মশাই-এর প্রতি কেশববাবুর যে কিরূপ শ্রদ্ধাভক্তি ছিল এবং তিনি যে তাঁহাকে কিরূপ উচ্চ অবস্থার লোক বলিয়া বুঝিতে পারিয়াছিলেন, তাহা তাঁহার এই উক্তি হইতেই বেশ বুঝা যায়।

প্রসঙ্গক্রমে, কেশববাবুর প্রতি আমাদের কিরূপ আকর্ষণ ছিল এবং আমরা তাঁহাকে কিরূপ শ্রদ্ধা-ভক্তি করিতাম, তাহা এ স্থলে উল্লেখ করিতেছি।

সম্ভবতঃ, ১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে মাঘোত্সবের সময়, বিকালবেলা, কেশববাবু শেষ বার কোম্পানির বাগানে (বিডন গার্ডেন-এ) বক্তৃতা দিয়াছিলেন। বাগানে তখন একটি 'ব্যাণ্ডষ্ট্যাণ্ড' বা বাজনা বাজাইবার জন্য একটি ইটের চবুতর বা মঞ্চ গাঁথা ছিল। কেশববাবু সেখানে দাঁড়াইয়া বক্তৃতা দিতে লাগিলেন। আমরা অনেকেই বক্তৃতা শুনিতে গিয়াছিলাম। কেশববাবুর শেষ বাণী হইল - "মাতবি তো মেতে যা।" তাহার পর তিনি সদলবলে কোম্পানির বাগান হইতে বিডন ষ্ট্রীট দিয়া আসিতে লাগিলেন। আমরাও অনেকে পিছনে পিছনে আসিতে লাগিলাম। দলটি পরে দুই ভাগে বিভক্ত হইয়া যাইল। কেশববাবু একটি দল লইয়া মাণিকতলা ষ্ট্রীট দিয়া সুরেশ মিত্তিরের বাড়ির দিকে আসিতে লাগিলেন। আমরা অনেকে তাঁহার দলে ছিলাম। কেশববাবুর হাতে রামদাদার তৈয়ার করানো সর্বধর্ম-চিহ্ন-দণ্ডটি1 ছিল। সুরেশ মিত্তিরের বাড়িতে আসিলে, তিনি চিহ্ন-দণ্ডটি অপরের হাতে দিয়া খোলটি নিজের গলায় ঝুলাইয়া, উঠানে ও ঠাকুরদালানে কীর্তন গাহিতে লাগিলেন। গানটি হইল:

"চিদাকাশে হল পূর্ণ প্রেম-চন্দ্রোদয় রে।
(জয় দয়াময়! জয় দয়াময়! বল, জয় দয়াময়!)
উথলিল প্রেমসিন্ধু কি আনন্দময়।" ইঃ।

গানটি খুব জমিয়া গিয়াছিল। নরেন্দ্রনাথ এই গানটি অনেক সময় গাহিত। সুরেশ মিত্তিরদের বাড়ি হইতে কেশববাবুর দল গানটি গাহিতে গাহিতে শিমলা ষ্ট্রীট দিয়া বড় রাস্তায়, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীটে পৌঁছিল। এদিকে প্রতাপবাবু অপর দলটি লইয়া গান গাহিতে গাহিতে বড় রাস্তা দিয়া আসিলেন। প্রতাপবাবুর দলের গানটি আমার স্মরণ নাই। কেশববাবুর দলের গানটি খুব লোকরঞ্জক হইয়াছিল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে খানিক দূর পর্যন্ত গিয়া রাত্রি হওয়ায় বাড়িতে ফিরিয়া আসিলাম।

এই ঘটনা হইতে বেশ বুঝা যায় যে, পরমহংস মশাই-এর ভক্তদিগের সহিত কেশববাবুর কিরূপ সদ্ভাব ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং পরস্পরের প্রতি কিরূপ আকর্ষণ ছিল।

কেশববাবুর প্রতি আমাদের কিরূপ শ্রদ্ধা-ভক্তি ছিল, সে বিষয় আর একটি ঘটনার উল্লেখ করিলেই পর্যাপ্ত হইবে, যদিও ঘটনাটি খুব বিষাদময়।

কেশববাবু দেহরক্ষা করিলে পর যখন সমারোহ করিয়া তাঁহার শব লইয়া যাওয়া হইতেছিল, তখন আমরা সকলে "ব্রহ্মকৃপাহি কেবলম্" উচ্চারণ করিতে করিতে আসিয়া সাধারণ সমাজের সম্মুখে কৌচ নামাইলাম। একখানি কৌচে কেশববাবুর দেহ রাখা হইয়াছিল। শীতকাল, এইজন্য গায়ে একখানি সাদা আলোয়ান দেওয়া হইয়াছিল। মুখ অনাবৃত ছিল, ঠিক যেন নিদ্রা যাইতেছেন - স্থির প্রশান্ত বদন, কোনো বিকৃত ভাব নাই, কেবল চোখে চশমা ছিল না, সাধারণ অবস্থা হইতে এই যা তফাৎ। তাহার পর লোক বাড়িতে লাগিল। আমরা শব লইয়া ব্রহ্মনাম উচ্চারণ করিতে করিতে, ধীরে ধীরে, বেথুন কলেজের পাশ দিয়া বিডন ষ্ট্রীট হইয়া বিডন গার্ডেন-এর কাছে যাইলাম। বেলা তখন সাড়ে-তিনটা কি চারটা হইবে। লোকসংখ্যা ও গাড়ির সংখ্যা আরো অধিক হইল। আমি নিমতলা ঘাট ষ্ট্রীটে আর অগ্রসর হইতে পারিলাম না। নরেন্দ্রনাথ কিন্তু বরাবর সঙ্গে সঙ্গে গিয়াছিল এবং শবদাহ শেষ হইতে রাত্রিতে ফিরিয়াছিল।


1. ইহাতে বিভিন্ন ধর্মের প্রতীক লাঞ্ছিত ছিল।

Wednesday, May 16, 2018

রাজমোহন বসুর মাঘোত্সবে

রাজমোহন বসু নামে নন্দকুমার চৌধুরী লেনে, কেশববাবুর একজন ভক্ত ছিলেন। তিনি অতি সৎ ও ধর্মপরায়ণ ছিলেন। এক বার মাঘোত্সবের কয়েক দিন পূর্বে তিনি নিজের বাড়িতে উৎসব করিলেন। কেশববাবুর সমাজের ভক্তেরা তখনকার প্রথা-মতো মাঘোত্সবের কয়েক দিন নিজ নিজ বাড়িতে একটি করিয়া নিশান তুলিতেন। এগারোই মাঘ এই নিশানব্রত সমাপন হইত। রাজমোহন বসুর বাড়িতে জায়গা অল্প হওয়ায়, পাশের নন্দ চৌধুরীর বাড়িতে উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। বিকালবেলা রাখাল ও আমি সেখানে গিয়াছিলাম। উঠানে কীর্তন হইতেছিল:

"মন একবার হরি বল, হরি বল;
জলে হরি, স্থলে হরি, অনলে অনিলে হরি।" ইঃ।

কীর্তন সমাপ্ত হইলে, ঠাকুরদালানে, পণ্ডিত গৌরগোবিন্দ রায় ভাগবত পাঠ ও ব্যাখ্যা করিতে লাগিলেন। সন্ধ্যার সময় নরেন্দ্রনাথ উঠানে যেখানে কীর্তন হইতেছিল তাহার এক পাশে গিয়া বসিল। খানিকক্ষণ পর কেশববাবু ও পরমহংস মশাই আসিলেন। রাখাল, নরেন্দ্রনাথ সেখানে রহিল। কি কথাবার্তা হইয়াছিল, তাহা আমি জানি না। জনসমাগম অধিক হইয়াছিল, কীর্তনাদিও খুব হইয়াছিল, এমন কি, পাড়াতে বেশ একটি হই-চই পড়িয়া গিয়াছিল।

Tuesday, May 15, 2018

সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে

পরমহংস মশাই, এক দিন রবিবার সন্ধ্যার সময় হঠাৎ সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে যাইয়া উপস্থিত হন। নরেন্দ্রনাথ উপরকার বারাণ্ডায় যেখানে গান হইত, সেইখানে ছিল। সে তাড়াতাড়ি নামিয়া আসিয়া তাঁহার কাছে আসিল এবং অনুনয় করিতে লাগিল যেন তিনি সেখান হইতে চলিয়া যান। সাধারণ সমাজের ভাব অন্য প্রকার হওয়ায় নরেন্দ্রনাথ অতীব শঙ্কিত হইয়াছিল এই ভাবিয়া, পাছে সমাজের লোকেরা তাঁহাকে কোনোপ্রকার অসম্মান করেন। পরমহংস মশাই খানিকক্ষণ সেখানে রহিলেন। নরেন্দ্রনাথ তাঁহার পাশে পাশে ছিল। অবশেষে, পরমহংস মশাই চলিয়া আসেন। তিনি বলিয়াছিলেন, "ডাল-খিচুড়ি সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ।" - অর্থাৎ পাঁচ-মিশালী; সব জিনিস হইতেই কিছু কিছু লওয়া হইয়াছে, কোনোটাই পুরা মাত্রায় নয়।

শিমলায় অন্যান্য বাড়িতে

পরমহংস মশাই শিমলাতে আসিলে, কখনো কখনো মনোমোহনদাদার বাড়িতে অল্পক্ষণের জন্য বসিয়া, রামদাদার বাড়িতে যাইতেন। শিমলার অন্যান্য বাড়িতেও তাঁহার যাতায়াত ছিল।

এক দিন, বিকালবেলা, পরমহংস মশাই কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট দিয়া গাড়ি করিয়া যাইতেছিলেন। ডাক্তার বিহারী ভাদুড়ী দোতলায় বারাণ্ডাতে দাঁড়াইয়াছিলেন। তিনি সসম্ভ্রমে পরমহংস মশাইকে উপরে লইয়া যান, এবং তাঁহার সহিত খানিকক্ষণ কথাবার্তা কহেন। বোধ হয়, বিহারী ভাদুড়ীর সহিত পরমহংস মশাই-এর পূর্ব হইতে জানাশুনা ছিল।

পরমহংস মশাই এক বার অষ্টমীর দিন, বেলা তিনটার সময়, গোসাঁইদের বাড়িতে দুর্গাপূজায় আসিলেন। সদর দরজায় ঢুকিতে ডান দিকে রাস্তার ধারের ঘরটিতে তিনি কয়েক মিনিট বসিয়াছিলেন। আমরা পাড়ার অনেক লোক সেখানে যাইলাম। মহেন্দ্র গোস্বামীর সহিত তিনি অনেক কথাবার্তা কহিলেন। সুরেশ মিত্তিরদের তখন নূতন গাড়ি কেনা হইয়াছিল, এইজন্য সুরেশ মিত্তির অতি আগ্রহের সহিত তাঁহাকে নূতন গাড়িতে বসাইয়া নিজেদের বাড়িতে লইয়া গেলেন। আমরা আর যাই নাই। সুরেশ মিত্তিরদের বাড়ি হইতে সেদিন তিনি প্রতিমাদর্শনের জন্য অন্য কোথায় কয়েকটি বাড়িতে চলিয়া গিয়াছিলেন।

পরমহংস মশাই সুরেশ মিত্তিরদের বাড়িতে অনেক বার গিয়াছিলেন। সেখানে গিয়া তিনি খানিকক্ষণ থাকিতেন। সুরেশ মিত্তিরের বাড়ির অপর সকলের ভাব অন্য প্রকার হওয়ায়, তাঁহার বাড়িতে কখনো উৎসবাদি হয় নাই। পাছে বাড়ির কেহ কিছু মনে করে এইজন্য সুরেশ মিত্তির অতি সংকোচে থাকিতেন এবং পরমহংস মশাইকে বাড়িতে লইয়া যাইয়া বিশেষ উৎসবাদি করিতে পারিতেন না। মিত্তিরদের বাড়ি যদিও আমাদের বাড়ির সংলগ্ন ছিল কিন্তু তখনকার দিনে তাঁহাদের বাড়িতে আমরা সর্বদা যাইতাম না; নিমন্ত্রণ করিলে তবে যাইতাম। এইজন্য সুরেশ মিত্তিরদের বাড়িতে যে সকল ঘটনা ঘটিয়াছিল তাহা আমি নিজে দেখি নাই, অপরের মুখে শুনিয়াছি।

এক দিন অপরাহ্নে, পরমহংস মশাই সুরেশ মিত্তিরদের বাড়িতে যান। মিত্তিরদের বাড়ির কোনো ব্যক্তি উচ্চ সরকারি চাকরি করিতেন। তিনি পরমহংস মশাইকে দেখিয়াই মাতব্বরী চালে এইরূপ বলিতে লাগিলেন, - সুরেশ মিত্তির পরমহংস মশাইকে গুরু বলে স্বীকার করেছেন, মাঝে মাঝে দক্ষিণেশ্বরে গিয়ে থাকেন, হাতে করে তাঁর জন্য কিছু জিনিসও নিয়ে যান; শিমলার রামডাক্তার, নরেন্দ্রনাথ ও আরো কয়েকজন লোকও পরমহংস মশাই-এর অনুগত হয়েছে; পরমহংস মশাই ছোট ছেলেগুলিকে বখাচ্ছেন, নষ্ট করছেন, প্রভৃতি; - কথাগুলির তাৎপর্য এই যে, পরমহংস মশাই যেন একজন অকর্মণ্য লোক, কিছু কাজ-কর্ম করেন না, কেবল ছেলেগুলিকে খারাপ করিতেছেন। পরমহংস মশাই খানিকক্ষণ স্থির হইয়া কথাগুলি শুনিলেন, তাহার পর তিনি তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "তুমি কি কাজ করো?" তিনি সরকারি চাকরি করিতেন, এইজন্য গর্বিতভাবে উত্তর করিলেন, "আমি জগতের হিত করি।" কথাটি শুনিবামাত্রই পরমহংস মশাই অন্যবিধ হইয়া গেলেন, তাঁহার ভিতর হইতে যেন আর একটি ব্যক্তি আবির্ভূত হইল। তিনি বলিতে শুরু করিলেন, "যিনি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন, পালন করছেন, তিনি কিছু বোঝেন না - তুমি সামান্য মানুষ, তুমি জগতের হিত করছ? স্রষ্টার চেয়ে তুমি বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ?" পরমহংস মশাই এই বলিয়া তাঁহাকে কঠোর তিরস্কার করিলেন। তিনি তখন অপ্রতিভ ও জড়সড় হইয়া চুপ করিয়া গেলেন। পরমহংস মশাইকে এইরূপ কথা বলার জন্য লোকটির উপর সকলে বিরক্ত হইয়াছিল, কারণ তখন তাঁহার প্রতি অজ্ঞাতসারে সকলের বেশ একটি শ্রদ্ধার ভাব আসিতেছিল। পাড়াতে দিনকতক এই কথা বেশ চলিল; আমরা পরস্পর ঠাট্টা করিয়া বলিতাম, "কি হে, জগতের হিত করছ নাকি তুমি?" কয়েক মাস এইরূপ ঠাট্টা করা চলিয়াছিল।

স্বামী সারদানন্দ এক বার বলিয়াছিলেন যে, এক দিন পূজার সময়, পরমহংস মশাই সুরেশ মিত্তিরদের বাড়ি গিয়াছিলেন। পরমহংস মশাইকে ঠাকুরদালানে মারবেল পাথরের মেঝের উপর আহার করিতে দেওয়া হইয়াছিল। ঠাকুরদালানটি পশ্চিমমুখো। ঠাকুরদালানের দক্ষিণ দিকে দোতলা ঘর। মেয়েরা ঘরের জানালা হইতে পরমহংস মশাইকে দেখিতেছিলেন। পরমহংস মশাই-এর সম্মুখে অনেক লোক দাঁড়াইয়া তাঁহাকে আহার করাইতেছিলেন। পরমহংস মশাই উপু হইয়া বসিয়া আহার করিতেছিলেন। এইরূপ বসিয়া আহার করাই তাঁহার দেশের প্রথা। আমরাও দেখিয়াছি যে, পরমহংস মশাই আসনপিঁড়ি হইয়া বসিয়া আহার করিতেন না, হাঁটু দুইটি উঁচু করিয়া উপু হইয়া বসিয়া আহার করিতেন। তিনি আহার করিতেছেন ও বলিতেছেন যে, পূর্বে তিনি বড় বিভোর থাকিতেন, বাহ্যজ্ঞান কিছুই থাকিত না, কাপড় পরার কথা মনে থাকিত না, একেবারেই বে-ভুল, বে-এক্তিয়ার হইয়া থাকিতেন; কিন্তু এখন তাঁহার সে ভাবটি কাটিয়া গিয়াছে, এখন তিনি কাপড় পরিয়া থাকেন এবং লোকজনের সম্মুখে বেশ সভ্যভব্য হইয়া বসিয়া থাকেন। এই কথা শুনিয়া, উপস্থিত লোকসকল ও যে সকল মেয়েরা জানালা হইতে দেখিতেছিলেন, একটু হাসিয়া উঠিলেন। কেহ কেহ হাসিয়া বলিলেন, "আজ্ঞে, ও-কথা ঠিক তো বটেই!" সকলে এই বলিয়া আমোদ করিয়া তাঁহাকে একটু উপহাস করিতে লাগিলেন। পরমহংস মশাই উপু হইয়া বসিয়া একটু একটু খাইতেছেন ও এইরূপ কথা চলিতেছে। সকলেই মৃদু মৃদু হাসিতেছেন। বাঁ-দিকের বগলের প্রতি হঠাৎ পরমহংস মশাই-এর দৃষ্টি পড়িল। তিনি দেখেন যে, কাপড়খানি বাঁ-বগলের ভিতর জড়ানো রহিয়াছে আর তিনি দিগ্বসন হইয়া বসিয়া আছেন। এইরূপ দেখিয়া তিনি অপ্রতিভ হইয়া বলিলেন, "আরে ছ্যা! আমার ও-টা গেল না; কাপড় পরাটা আর মনে থাকে না!" এই বলিয়া তিনি তাড়াতাড়ি কাপড়খানি লইয়া কোমরে জড়াইতে লাগিলেন। যে সকল পুরুষ দাঁড়াইয়াছিলেন, তাঁহারা সকলে উচ্চরোলে হাসিয়া উঠিলেন, মেয়েরাও জানালা হইতে হাসিয়া উঠিলেন। কিন্তু পরমহংস মশাই-এর ভাব এত সরল, স্নিগ্ধ ও উচ্চ ছিল যে, কাহারো মনে দ্বিধা বা সংকোচ না আসিয়া এক অতীন্দ্রিয় ভাব আসিল। কেহ কেহ বলিলেন, "মশাই আপনার কাপড় পরবার দরকার নেই। আপনি যেমন আছেন, তেমনি থাকুন। আপনার কোন দোষ হয় না।"

ইহা বিশেষ লক্ষ্য করিবার বিষয় যে, একজন পুরুষ দিগ্বসন হইয়া বসিয়া আছেন, তাহাতে কাহারো মনে দ্বিধা বা সংকোচ আসিতেছে না; এমন কি, স্ত্রীলোকদিগের মধ্যেও কোন দ্বিধা বা সংকোচ বা লজ্জার ভাব আসিতেছে না। ইহা উন্মত্ত ব্যক্তির ভাব নয়, ইহা বালকের ভাবও নয়; ইহা এক অতীন্দ্রিয় ভাব - অন্য এক রাজ্যের ভাব - যাহাতে দ্বিধা বা সংকোচ ও দেহজ্ঞান প্রভৃতি কিছুই নাই। ইহা তর্ক-বিতর্কের বিষয় নয়; গভীর চিন্তা ও ধ্যানের বিষয়। নিমেষের মধ্যেই তিনি সকলের মনকে কোথায় তুলিয়া লইয়া যাইলেন, যেখানে জগতের সঙ্গে আর বিশেষ কোনো সম্পর্ক রহিল না। যীশুর বিষয়ে উল্লেখ আছে, "He was in the world, but not to the world" - তিনি জগতে ছিলেন, কিন্তু জগৎ তাঁহাকে স্পর্শ করিতে পারে নাই। এই বাণী এ স্থলেও প্রযোজ্য।

এইরূপে পরমহংস মশাই তখনকার দিনে শিমলার অনেক বাড়িতে ঘুরিয়া বেড়াইতেন। তিনি শিমলার সকলেরই এক প্রকার পরিচিত লোক ছিলেন, নিতান্ত ঘরের লোক ছিলেন। গুরুগিরির ভাব বা আড়ম্বর তাঁহার কিছুই ছিল না। অতি সাধারণ লোকের ন্যায়, তিনি ইচ্ছামতো এবাড়ি-ওবাড়ি যাইতেন; একলাই অনেক সময় যাইতেন; আর সকলেই তাঁহাকে আপনার লোক বলিয়া বিশেষ সম্মান করিতেন।

Friday, May 11, 2018

সুরেশ মিত্তিরের 'কারণ' করা

রামদাদা বৈষ্ণব মানুষ। মাংস তো তিনি কখনও খান নাই; মাছ কখনো খাইতেন, কখনো বা খাইতেন না। এক দিন রামদাদা পরমহংস মশাইকে বলিয়াছিলেন, "সুরেশ মিত্তির মদ খায়। তাকে বারণ করুন, যেন সে আর মদ না খায়।" - সুরেশ মিত্তির সওদাগরী অফিসের মুৎসদ্দী ছিলেন। তাঁহাকে সারা দিন খাটিতে হইত; এইজন্য সন্ধ্যার সময় 'কারণ'1 করিয়া অনেক সময় জপ করিতেন। কিন্তু এক এক সময় কারণের মাত্রা একটু বেশি হইয়া যাইত; তখন তিনি পরমহংস মশাই-এর বিষয় অধিক মাত্রায় কথা কহিতেন, তবে অন্য কোনো বিষয়ে চাঞ্চল্য হইত না। পরমহংস মশাই রামদাদার ঐ কথা শুনিয়া বিরক্ত হইয়া বলেন, "সুরেশ মদ খায়, তাতে তোর কি! ওর ধাত আলাদা, ও নিজের পথে যাবে।" সুরেশ মিত্তির আসিলে পরমহংস মশাই বলিলেন, "ইচ্ছে হয় তো মদ খেয়ো, কিন্তু যেন পা টলে না, মন টলে না।" আমরাও তদবধি দেখিতাম যে, সুরেশ মিত্তির সন্ধ্যার সময় কারণ করিয়া উপরের ছাদের পাঁচিলের পাশে বসিয়া নিম্নস্বরে শ্যামা-বিষয়ক গান শুরু করিতেন; তাহার পর, কণ্ঠস্বর উচ্চ হইত; ক্রমে করুণ স্বরে রোদন আরম্ভ করিতেন। পরে ক্রন্দনের মাত্রা এত অধিক হইত যে, আশ-পাশের সব বাড়ি হইতে উহা শুনা যাইত। মিত্তিরদের বাড়ি আমাদের বাড়ির ভিতরের দিকটার সংলগ্ন ছিল। এইজন্য আমরা তাঁহার ক্রন্দনের স্বর শুনিতে পাইতাম এবং তিনি উপরের ছাদে বসিয়া ক্রন্দন করিতেছেন, স্পষ্ট দেখিতে পাইতাম।


1. তন্ত্রসাধনার উপকরণ, মদ্য।

কাঁকুড়গাছির বাগানে

আমার এইরূপ শুনা আছে যে, রামদাদা এক দিন পরমহংস মশাইকে তাঁহার কাঁকুড়গাছির বাগানে লইয়া গিয়াছিলেন। তবে আমি নিজে এ বিষয় কিছু জানি না।

১৮৮৩ খ্রীষ্টাব্দে, রামদাদা ঐ জমি খরিদ করেন। বাবার1 পরামর্শমতো ও অনুমোদনক্রমে জমি সম্বন্ধে লেখাপড়া হইয়াছিল। রামদাদা পরে উহাতে বাগান2 করিয়াছিলেন।


1. শ্রীযুত বিশ্বনাথ দত্ত, কলিকাতা হাইকোর্টের অ্যাটর্নি ছিলেন।

2. বর্তমানে এই বাগান 'যোগোদ্যান' নামে খ্যাত।

পরমহংস মশাই ও নরেন্দ্রনাথ

পরমহংস মশাইকে কেহ কেহ ভক্তি করিতেন, তাঁহার জন্য উৎসবাদি করিতেন ও দক্ষিণেশ্বরে দ্রব্যাদি পাঠাইতেন, কিন্তু নরেন্দ্রনাথ প্রভৃতি যুবকগণের উপর তাঁহার এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল; এইজন্য তিনি তাঁহাদিগকে এত খুঁজিয়া বেড়াইতেন এবং পরিশেষে যুবা রাখালকে কাছেও রাখিয়াছিলেন।

গুরুভক্তি ও গুরুর আদেশ পালন - এই দুইটির ভিতর বিশেষ পার্থক্য আছে। সাধারণ ভক্তেরা গুরুর দেহটিকেই শ্রেষ্ঠ বস্তু বলিয়া গণ্য করেন এবং গুরুর প্রতি যতটুকু ভক্তি করা প্রয়োজন বলিয়া তাঁহারা মনে করেন, ঠিক ততটুকু ভক্তি করিয়াই নিজেদের কার্যে ব্যস্ত থাকেন; তাঁহাদের গুরুভক্তি বা কার্য সেখানেই শেষ হইয়া থাকে। এই শ্রেণীর ভক্তেরা নীচেই পড়িয়া থাকেন, উচ্চ অবস্থায় আর উঠিতে পারেন না; এমন কি, কালে মুমূর্ষু জড়পিণ্ডবৎ হইয়া যান।

অধিকাংশ লোকই কেবল গুরুভক্তি দেখাইয়া কর্তব্য শেষ করিতেন; কিন্তু নরেন্দ্রনাথ-প্রমুখ কয়েকজন মাত্র যুবক, গুরুর আদেশ পালন করিয়াছিলেন। বলা বাহুল্য, গুরুভক্তি অপেক্ষা গুরুর আদেশ পালন করাই শ্রেষ্ঠ। এ বিষয়ে অনেক কিছু চিন্তা করিবার ও বলিবার আছে। ইহা নিজে নিজে বুঝিয়া লওয়া উচিত।

যাহা হউক, পরমহংস মশাই, প্রথম হইতেই নরেন্দ্রনাথ-প্রমুখ যুবকগণের যে কিরূপ শ্রদ্ধা-ভক্তি ছিল, তাহা বুঝিতে পারিয়াছিলেন। এইজন্য যাঁহারা তাঁহাকে মাত্র ভক্তি করিতেন, তাঁহাদের অপেক্ষা যাঁহারা ভবিষ্যতে তাঁহার আদেশ পালন করিবেন, তাঁহার ভাবসমূহ জগৎকে দিবেন ও কার্যে পরিণত করিবেন, তাঁহাদিগকে প্রথম হইতেই তিনি বিশেষ আপনার করিয়া লইয়াছিলেন; তাঁহাদের উপরই তাঁহার বিশেষ টান ছিল। অপর সকলকে তিনি ভক্ত হিসাবে ভালবাসিতেন মাত্র।

এ বিষয়ে এক দিনকার একটি ঘটনা উল্লেখ করিতেছি। শুনিয়াছি যে, নরেন্দ্রনাথ পরমহংস মশাই-এর নিকট যাইবার কিছু কাল পরে, কোনো এক যুবক আর একজনের সহিত দক্ষিণেশ্বরে যান। যুবকটির সঙ্গে যে লোকটি ছিলেন তাঁহার কাছে নরেন্দ্রনাথের কুশল সংবাদ পাইয়া পরমহংস মশাই বলিলেন, "লরেন অনেক দিন আসেনি, দেখতে ইচ্ছে হয়েছে এক বার আসতে বলো।" পরমহংস মশাই-এর সহিত কথাবার্তা কহিয়া, রাত্রে তাঁহারা তাঁহার ঘরের পূর্বদিকের বারাণ্ডায় উভয়ে শয়ন করিলে কিছু কাল পরেই, পরমহংস মশাই বালকের মতো তাঁহার পরনের কাপড়খানি বগলে করিয়া তাঁহাদের একজনকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, "তুমি কি ঘুমোচ্ছ?" যাঁহাকে ডাকিয়া পরমহংস মশাই জিজ্ঞাসা করিলেন, তিনি উত্তর করিলেন, "আজ্ঞে না।" পরমহংস মশাই বলিলেন, "দেখ, লরেনের জন্য প্রাণের ভেতর যেন গামছা-নেংড়ানোর মতো মোচড় দিচ্ছে!" সে-রাত্রিতে নাকি পরমহংস মশাই-এর নরেন্দ্রনাথের জন্য উৎকণ্ঠ ভাব কিছুমাত্র কমে নাই। কারণ তিনি কিছুক্ষণ শয়ন করিবার পর, আবার আসিয়া ঐ কথাই বলিতে লাগিলেন। যেন, নরেন্দ্রনাথের অদর্শনের জন্য বড়ই ব্যথিত হইয়া পড়ায় তাঁহার ঘুম হইতেছিল না।

পরমহংস মশাই, আমাদের গৌরমোহন মুখার্জী ষ্ট্রীটের বাড়িতে, নরেন্দ্রনাথকে মাঝে মাঝে খুঁজিতে আসিতেন; কিন্তু কখনো বাড়ির ভিতর প্রবেশ করেন নাই, রাস্তায় অপেক্ষা করিতেন। তিনি বাড়ির একটু কাছে আসিলে, অনেক সময় আমি অগ্রসর হইয়া যাইতাম। আমায় বলিতেন, "লরেন কোথায়, লরেনকে ডেকে দাও।" আমি তাড়াতাড়ি আসিয়া দাদাকে সন্ধান করিয়া ডাকিয়া দিতাম। অনেক সময় পরমহংস মশাই নরেন্দ্রনাথের সহিত কথাবার্তা কহিয়া তাহাকে ডাকিয়া লইয়া যাইতেন।

পরমহংস মশাই নরেন্দ্রনাথকে আদর করিয়া 'শুকদেব' বলিয়া ডাকিতেন; শুকদেব যেন দ্বিতীয় বার জগতে আসিয়াছেন। নরেন্দ্রনাথ শুকদেবের মতো জ্ঞানী হইবে, জগতে সমস্ত কার্য করিবে, কিন্তু জগৎকে ছুঁইবে না, প্রভৃতি বহুবিধ অর্থে তিনি নরেন্দ্রনাথকে শুকদেব বলিতেন। বাবা এই কথা শুনিয়া আনন্দিত হইয়া বলিতেন, "হ্যাঁ, হয়েছে বটে, ব্যাসদেবের বেটা শুকদেব। ম্যাক্নামারার বেটা কফিন-চোর!" - অর্থাৎ, ব্যাসদেবের পুত্র শুকদেব মহৎ হইয়াছিলেন, এ কথা সত্য; কিন্তু বড়সাহেব ম্যাক্নামারার পুত্র হইল কিনা শবাধার-চোর! নরেন্দ্রনাথ সেই রকম হইবে! তখনকার দিনে 'কফিন-চোর' কথাটির বড় প্রচলন ছিল। নরেন্দ্রনাথ যে ভবিষ্যতে একজন শ্রেষ্ঠ লোক হইবে, এই কথা শুনিয়া আনন্দিত হইয়া তিনি বিদ্রূপ করিয়া এইরূপ বলিতেন। তিনি বিরক্ত হইতেন না, বরং খুশি হইতেন।

নরেন্দ্রনাথ ছুটি পাইলে, নিজে নৌকা বাহিয়া দক্ষিণেশ্বরে যাইত। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসের ঝড়ের সময় নরেন্দ্রনাথ গঙ্গা দিয়া নৌকা বাহিয়া যাইত, এইজন্য, বাবা অনেক সময় বিরক্ত হইতেন। তিনি বলিতেন, "যাতায়াতের একখানা গাড়ি করে গেলেই তো হয়। এ রকম ঝড়-তুফানে গঙ্গা দিয়ে যাবার কি দরকার? রাম তো টানা গাড়ি করে যায়। - একেই বলে ডানপিটে ছেলের মরণ গাছের আগায়। এ রকম ডানপিটেমি করার কি দরকার?" কিন্তু নরেন্দ্রনাথ এ সকল কথায় বিশেষ কান না দিয়া, নিজের মনোমত দুই-একটি বন্ধু সঙ্গে লইয়া নৌকা করিয়া অনেক সময় দক্ষিণেশ্বরে যাইত। হেদোর পুকুরে নরেন্দ্রনাথ প্রভৃতি সকলে নৌকার দাঁড় টানিতে বেশ পারদর্শী হইয়াছিল। আহিরীটোলার ঘাটে একখানি নৌকা ভাড়া করিয়া, অনেক সময় নিজেরাই মাঝিদের দাঁড় লইয়া টানিতে টানিতে দক্ষিণেশ্বরে যাইত। এইরূপ যাওয়াতে কতকটা নৌকা বাহিয়া আমোদ করা হইত এবং পরমহংস মশাইকে দর্শন করিতে যাওয়াও হইত।

তখনকার দিনে দক্ষিণেশ্বরে গাড়ি করিয়া যাইবার পথ অতি কষ্টকর ছিল। গরাণহাটা হইতে বরানগরের বাজার পর্যন্ত গাড়ি যাইত, তাহার পর, সমস্ত পথটা হাঁটিয়া যাইতে হইত। আলমবাজার ও দক্ষিণেশ্বর প্রভৃতি স্থানসমূহ একেবারে পাড়াগাঁ ছিল। মাঝে মাঝে গোলপাতার ঘর, ফাঁকা মাঠ, জঙ্গল ও পুকুর; এখনকার মত এত বসতি ছিল না। দক্ষিণেশ্বর সামান্য একটি ছোট গ্রামের মতো ছিল। আমরা গিরিশবাবুর ঘর হইতে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির সর্বদাই দেখিতে পাইতাম। কারণ, তখন মাঝখানে উঁচু ঘর-বাড়ি ইত্যাদি বিশেষ কিছু ছিল না। গিরিশবাবু ও অপর সকলে সন্ধ্যার সময় উত্তর দিকে মুখ করিয়া দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরকে প্রণাম করিতেন। এখন অনেক বাড়ি হওয়ায়, গিরিশবাবুর বাড়ি হইতে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির আর দেখা যায় না। ইহা হইল ১৮৮৩ বা ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দের কথা।

নরেন্দ্রনাথ কোনো কথা মানিয়া লইবার পাত্র ছিল না। তর্ক-যুক্তি ও বিশেষ বিচার না করিয়া, সে কখনো অপরের কোনো কথা গ্রাহ্য করিয়া লইত না। পান্তাভেতে মুমূর্ষু ভাব তাহার ভিতর আদৌ ছিল না। পরমহংস মশাই-এর কাছে যে সকল মুমূর্ষু ভক্ত যাইতেন, তাঁহারা বলিতেন, "এ ছোঁড়া কি দাম্ভিক! বড়মানুষের বেটা, কলেজে পড়ে, তাই এত অহঙ্কার।" হরমোহন মিত্রের নিকট শুনিয়াছি যে, কথাপ্রসঙ্গে পরমহংস মশাই নরেন্দ্রনাথকে এক দিন বলিয়াছিলেন, "তুই যদি কথা না শুনিস, তবে এখানে কি করতে আসিস?" নরেন্দ্রনাথ অমনি চট্ করিয়া জবাব দিল, "তোমার কাছে আবার শিখবো কি? তুমি কী-বা পেয়েছো, তোমার কাছে শেখবার বিশেষ এমন কী আছে?" পরমহংস মশাই তাহাতে বলিলেন, "তোর শেখবার যদি কিছু না থাকে, তবে এমন ঝড়-ঝাপটে আসিস কেন?" নরেন্দ্রনাথ অমনি উত্তর করিল, "তোমায় ভালবাসি বলে দেখতে আসি।" পরমহংস মশাই সমাধিস্থ হইয়া নরেন্দ্রনাথকে জড়াইয়া ধরিলেন। তাহার পর বলিতে লাগিলেন, "দেখ, সকলেই কিছু স্বার্থের জন্য আসে, যে যার অভীষ্টসিদ্ধির জন্যে আসে। লরেন কিন্তু ভালবাসে বলে আসে, ওর কোনো অভীষ্ট এখানে নেই। এ হল নিঃস্বার্থ ভালবাসা। আর সকলে যারা আসে, তারা কোনো আকাঙ্ক্ষা করে আসে।" উপস্থিত ব্যক্তিসকল প্রথমে নরেন্দ্রনাথের প্রতি বিশেষ বিরক্ত হইয়াছিলেন; তাঁহারা ভাবিয়াছিলেন যে, দাম্ভিক ছোঁড়াটা পরমহংস মশাই-এর মুখের উপর চটপট উত্তর করে। কিন্তু পরমহংস মশাই যখন নরেন্দ্রনাথকে প্রশংসা করিলেন, তখন সকলে নীরব হইয়া রহিলেন।

নরেন্দ্রনাথ সব সময় পরমহংস মশাইকে বলিত, "তুমি মুক্খু লোক, লেখাপড়া জান না, তোমার কাছে আবার দর্শনশাস্ত্রের কথা কি শিখবো? আমি এ সব বিষয় ঢের জানি।" কখনো কখনো তর্কের ছলে তাহার কথার মাত্রা আরো বাড়িয়া যাইত। অপরে ইহাতে বিরক্ত বা মনঃক্ষুণ্ণ হইতেন। পরমহংস মশাই হাসিতে হাসিতে বলিতেন, "ও আমাকে গাল দেয়, কিন্তু ভেতরে যে শক্তি আছে, তাকে গাল দেয় না।" পরমহংস মশাই-এর কী গুণগ্রাহী ভাব, কী উদার ভাব! সংকীর্ণ ভাব, গুরুগিরির ভাব - এ সব কিছুই তাঁহার ছিল না। এইজন্য, তিনি ঝাঁজালো ও তেজী নরেন্দ্রনাথের এত প্রশংসা করিতেন এবং তাহাকে এত ভালবাসিতেন। ইহাকেই বলে কদর দান, গুণের আদর করা।

নরেন্দ্রনাথ এইরূপ ঝাঁঝালো মেজাজে পরমহংস মশাই-এর সহিত সমান সমান ভাবে তর্ক করিত। পরমহংস মশাইও তাহাতে হাসিয়া আনন্দ করিতেন। এক ব্যক্তি নরেন্দ্রনাথের অনুকরণ করিয়া পরমহংস মশাই-এর সহিত কথা কহিতে গিয়াছিলেন। পরমহংস মশাই অমনি বিরক্ত হইয়া বলিয়াছিলেন, "লরেন বলে - লরেন বলতে পারে, তা বলে তুই বলতে যাস নি। তুই আর লরেন এক না।" এই বলিয়া তাঁহাকে ধমক দিয়াছিলেন!

দেখা গিয়াছে যে, অতি শৈশবকাল হইতেই নরেন্দ্রনাথ কাহারো কথা অল্পতেই মাথা পাতিয়া লইত না বা নিজ অপেক্ষা অপর কাহাকে সহজে বড় বলিয়া মনে করিত না। এইরূপ ভাবই তাহার স্বাভাবিক শক্তির পরিচায়ক। সর্বদাই তাহার ভিতর এই একটি ভাব ছিল - যত বড় লোকই আসুক না কেন, সে নিজের ভিতর হইতে শক্তি উদ্বুদ্ধ করিয়া, সেই প্রতিদ্বন্দ্বীর শক্তির তুল্য শক্তি দেখাইতে পারে; এমন কি, প্রতিদ্বন্দ্বীর শক্তি অপেক্ষা আরো অধিক শক্তি বিকাশ করিতে পারে। নরেন্দ্রনাথ নিজ হইতে উচ্চতর ব্যক্তিকে বিশেষ সম্মান করিত, নিম্নতর ব্যক্তিকে স্নেহ করিত, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বীকে সহ্য করিতে পারিত না; প্রতিদ্বন্দ্বীকে যতক্ষণ পর্যন্ত না বিধ্বস্ত বা পরাভূত করিতে পারিত, ততক্ষণ পর্যন্ত সে ক্ষান্ত হইত না। ইহা হইল তাহার শক্তিমত্তার বিশেষ লক্ষণ। নীচু বা অবনত হওয়া তাহার প্রকৃতিবিরুদ্ধ ছিল। কিন্তু সাধারণ হইতে সে যে উচ্চ - এ বোধ থাকিলেও, কাহাকেও অবজ্ঞা বা অসম্মান দেখানোও তাহার রীতি ছিল না। অপরকে সম্মান করিব, শ্রদ্ধা করিব, কিন্তু নিজের প্রাধান্য ও শক্তি বা ব্যক্তিত্ব অটুট রাখিব, এই ছিল তাহার ভাব। যাঁহারা দুর্বলমস্তিষ্ক ছিলেন তাঁহারা নরেন্দ্রনাথের এই ভাব বুঝিতে না পারিয়া অনেক সময় বলিতেন, "নরেন অতি দাম্ভিক, অহংকারী; হামবড়াইগিরি তার বড্ড বেশি।"

জগতের কাছে আমি ভিক্ষা লইতে আসি নাই, আমি জগৎকে ভিক্ষা দিব, আমার অফুরন্ত ভাণ্ডার আছে, এই ছিল নরেন্দ্রনাথের আশৈশব ভাব। শুনিয়াছি, পরমহংস মশাই এক দিন আহ্লাদ করিয়া নরেন্দ্রনাথকে একটি জিনিস দিতে গিয়াছিলেন। নরেন্দ্রনাথ অমনি বলিয়া উঠিল, "তোমার কাছে জিনিস নেবো কেন আমি? আমার কিসের অভাব? তুমি এ জিনিস অপরকে দাও গে যাও, আমি নেবো না।" এই সামান্য কথাগুলিতেই নরেন্দ্রনাথের মনোভাব বুঝা যায়।

বুদ্ধের জীবনী পাঠ করিলে দেখা যায় যে, যখন তিনি কুমার সিদ্ধার্থরূপে নিজ গৃহে ছিলেন বা যখন তিনি তাপস গৌতমরূপে বিচরণ করিতেন এবং নিজের এক মুষ্টি অন্নও জুটিত না, উভয় অবস্থাতেই তাঁহার উচ্চ ভাব ও ওজস্বী ভাব ছিল। এইজন্য লোকে তাঁহাকে 'সুন্দর শ্রমণ' 'মহাশ্রমণ' বলিত।

সুপুরুষ-সন্ন্যাসী, মহাসন্ন্যাসী বা মহাত্যাগী হওয়া এক কথা, আর ভিখারী হওয়া আর এক কথা। কোনো কিছু দিয়া ইহার পরিমাপ করা যায় না কারণ ইহা হইল মনের বৃত্তি। একজন সর্বত্যাগী, গাছের তলায় পড়িয়া থাকা সত্ত্বেও তাহার রাজকীয় ভাব দীপ্ত থাকে; আর এক জনের বহু বিত্ত থাকিলেও তাহার ভিখারীর ভাব দূর হয় না। নরেন্দ্রনাথ পরমহংস মশাই-এর কাছে যাইত ভিখারীর ভাবে নয়; য়ুরোপীয় দর্শনশাস্ত্রাদিতে যাহা পাঠ করিয়াছিল তাহা কতদূর সত্য, মিলাইয়া লইবার জন্য পরমহংস মশাই-এর কাছে যাইত এবং তর্ক-যুক্তি ও বাদানুবাদ করিয়া সেই সকল মতের সিদ্ধান্ত করিয়া লইত।

এক দিন নরেন্দ্রনাথ একটি যুবককে বলিয়াছিল, "ওঁর কাছে যাই, সমাজ বা অন্য বিষয় শেখবার জন্যে নয়। এ সব বিষয় ওঁর কাছে শেখবার কিছুই নেই। এ সব বিষয় আমি ঢের পড়েছি, ঢের জানি, তবে দেখ, ওঁর কাছে Spirituality - ব্রহ্মজ্ঞান শিখতে হবে। এটা ওঁর কাছে আশ্চর্যরকম আছে।"

বোধিসত্ত্বের আরাড়কালাম, রামপুত্র রুদ্রক প্রভৃতি পণ্ডিতগণের সহিত বিচারের বিষয় পাঠ করিলে, পরমহংস মশাই-এর সহিত নরেন্দ্রনাথের বিতর্ক অনুরূপ বলিয়া বোধ হয়।

অপ্রিয় হইলেও, নরেন্দ্রনাথ তর্ককালে দুই-একটি কড়া কথা বলিয়া ফেলিত। উপস্থিত-উত্তর দেওয়ার ক্ষমতাও ছিল তাহার অতি আশ্চর্যরূপ - দৈবশক্তির মতো। এইজন্য, কেহ তাহার সহিত তর্ক করিতে সাহস করিত না।

এক দিন ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের সহিত নরেন্দ্রনাথের তর্ক হইতেছিল। ডাক্তার সরকার তর্কের সময় অনেক পুস্তকের নাম করিতে লাগিলেন। নরেন্দ্রনাথ চট্ করিয়া বলিয়া উঠিল, "মশাই, আপনি কি বইটা পড়েছেন, না দেখেছেন?" ইহাতে ডাক্তার সরকার হঠাৎ কিছু উত্তর দিতে পারিলেন না। তখন নরেন্দ্রনাথ আবার প্রশ্ন করিল, "না, জিগ্গেস করছি, বইটা মাত্র উলটে দেখেছেন, না পড়েছেন?" অবশেষে, ডাক্তার সরকার অপ্রতিভ হইয়া স্বীকার করিলেন যে, তিনি পুস্তকের খানিক অংশ মাত্র পড়িয়াছেন। নরেন্দ্রনাথ অমনি পুস্তকের অনেক স্থান উদ্ধার করিয়া ডাক্তার সরকারকে শুনাইতে লাগিল এবং বলিল, "আমি ঐ বইখানা অনেক দিন আগে পড়েছি।" ডাক্তার সরকার আশ্চর্যান্বিত হইয়া বলিলেন, "এত অল্প বয়সের ছেলে যে এত পড়েছে, তা আমি কখনো জানতুম না।"

কাশীপুরের বাগানে এই ঘটনা ঘটিয়াছিল। গিরিশবাবুও এই সময় উপস্থিত ছিলেন। গিরিশবাবু খুব পণ্ডিত লোক। তিনিও অবাক হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, নরেন্দ্রনাথ এই অল্প বয়সে কি করিয়া এত বই পড়িয়াছে! - এখানে জানা আবশ্যক যে, নরেন্দ্রনাথ ইংরেজী সাহিত্যে ও য়ুরোপীয় দর্শনশাস্ত্রে বিশেষ খ্যাতিলাভ করিয়াছিল। কি ইতিহাস, কি সাহিত্য, কি কাব্য, কি জ্যোতিষ, কি দর্শনশাস্ত্র প্রভৃতি বহু বিষয়ে সে সুপণ্ডিত ছিল।

পরমহংস মশাই কখনো কখনো আনন্দ করিয়া এই রকম তর্ক-বিতর্কের সময়ে কথাবার্তা কহিতে যাইতেন। নরেন্দ্রনাথ ছিল রুদ্রমূর্তি, তাহার কাছে খাতির-আবদার বড় চলিত না। সে নিজের ব্যক্তিত্বের পরিমাণ বুঝিত। তখন অনেক সময় নরেন্দ্রনাথ মুখঝামটা দিয়া পরমহংস মশাইকে বলিত, "তুমি দর্শনশাস্ত্রের কি জান? তুমি তো একটা মুক্খু লোক।" পরমহংস মশাই আনন্দিত হইয়া হাসিতে হাসিতে বলিতেন, "লরেন আমাকে যত মুক্খু বলে, আমি তত মুক্খু লই!" তিনি নিজের বাঁ-হাতের চেটোতে ডান হাতের আঙুল দিয়া দেখাইয়া বলিতেন, "আমি অক্ষর জানি।" অর্থাৎ অক্ষর চেনা পর্যন্ত তাঁহার বিদ্যালাভ হইয়াছিল।

এ স্থলে ইহা বিশেষ দ্রষ্টব্য যে, পরমহংস মশাই-এর সহিত নরেন্দ্রনাথের মতো কেহ কথা কহিতে সাহস করিত না। মাত্র নরেন্দ্রনাথই নির্ভীক হইয়া পরমহংস মশাইকে এরূপ কথা বলিত। সাধারণ ভক্তেরা নরেন্দ্রনাথের এইরূপ কথাবার্তা অনেক সময় পছন্দ করিত না ও উহার ভাব বুঝিতে পারিত না। এক প্রদীপ হইতে অপর এক প্রদীপ জ্বালিয়া লইবার সময় একটি চিড়বিড় শব্দ হয় এবং পরে, উভয় প্রদীপের শিখা একই প্রকার হইয়া যায়, ইহা অনেকেই বুঝিতে পারিত না। যাহারা কৃপা-ভিখারী, তাহারা নরেন্দ্রনাথের এইরূপ আচরণে ও কথাবার্তায় অনেক সময় বিরক্তই হইত; কারণ, এই সকল ব্যাপার হইল তাহাদিগের ধারণার অতীত। Self-assertion - আত্ম-প্রতিষ্ঠা যে অন্যবিধ ভাব, তাহা তাহারা বুঝিতে পারিত না। তাহারা মনে করিত, নির্জীব ও মুমূর্ষু হইয়া কথা শুনিয়া যাওয়াই শ্রেয়। কৃপা-ভিখারী হওয়া - এই ভাবটি নরেন্দ্রনাথ অত্যন্ত ঘৃণা করিত। নিজের ব্যক্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রাখিয়া ও নিজের প্রাধান্য বজায় রাখিয়া অপরকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করাই ছিল নরেন্দ্রনাথের চরিত্রের বিশেষ লক্ষণ। এইজন্য অপর ভক্তগণের সহিত তাহার মিল হইত না। নরেন্দ্রনাথ রুদ্রভাব দিয়া প্রগাঢ় শ্রদ্ধা-ভক্তি দেখাইত। ইহাই হইল ক্ষাত্রশক্তি। পূর্বকালে ক্ষত্রিয়েরা গুরুকে যুদ্ধে পরাভব করিয়া গুরুর সম্মান প্রচার করিতেন। মহাভারতে ও টড-এর রাজস্থান গ্রন্থের উদয়পুরের উপাখ্যানে এইরূপ ক্ষাত্রশক্তির অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়। নরেন্দ্রনাথের রুদ্র অংশে জন্ম; রুদ্র তাহার মূর্তি। রুদ্র অংশে জন্মগ্রহণ না করিলে, রুদ্রের ভাব কেহ বিকাশ করিতে পারে না। ইহা অপরের অনুকরণ করিতে যাওয়া বিড়ম্বনা মাত্র।

নরেন্দ্রনাথ যে ভবিষ্যতে সর্ববিজয়ী হইবে, পরমহংস মশাই পূর্বেই তাহার আভাস পাইয়াছিলেন। এইরূপ মুখঝামটার ভিতরও নরেন্দ্রনাথের যে তাঁহার প্রতি শ্রদ্ধা আছে তাহা বুঝিতে পারিয়া তিনি আনন্দ করিতেন; এই সময়কার কথাবার্তা যদি কেহ চেষ্টা করিয়া লিপিবদ্ধ করেন তো, তাহা হইলে একখানি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ হইতে পারে।

১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে ২৫শে ফেব্রুয়ারী আমার বাবার হঠাৎ মৃত্যু হয়। পূর্বের দিন চাকর, সরকার প্রভৃতি অনেক লোকজন ছিল; কিন্তু পর দিন আমরা একেবারে গরিব হইয়া পড়ি, কিছুই সংস্থান ছিল না। সংসারের সকল ভার নরেন্দ্রনাথের উপর পড়িল। সে তখন আইন পড়িতেছিল এবং এক অ্যাটর্নির আর্টিক্ল্ড ক্লার্ক হইয়াছিল। কিন্তু সেখান হইতে কিছু পাইবার আশা ছিল না। সংসার কি করিয়া চলিবে এই চিন্তায় নরেন্দ্রনাথ উদ্বিগ্ন হইয়া পড়িল। এইরূপ ভাবনায় তাহার মাথার ভিতর সর্বদা যন্ত্রণা হইত বলিয়া, মাথা ঠাণ্ডা করিবার উদ্দেশ্যে সে কর্পূরের নাস লইত। বাল্যকাল হইতেই তাহার নাস লওয়ার বদ্ অভ্যাস ছিল।

এই সময় গরমিকালে একদিন পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসেন। তিনি নরেন্দ্রনাথকে ডাকিয়া লইয়া যাইবার জন্য অনেক লোককে পাঠাইলেন; কিন্তু নরেন্দ্রনাথের অভিমান হওয়ায় কিছুতেই তাঁহার কাছে যাইল না। বাহিরের ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া সে একাকী বসিয়া রহিল, দরজা খুলিল না। তিন-চার জন লোক আসিয়া ফিরিয়া গেল। অবশেষে সন্ধ্যার সময় দেবেন মজুমদার মশাই নরেন্দ্রনাথকে ডাকিতে আসিলেন। দেবেনবাবুর কী অমায়িক ভাব, নরেন্দ্রনাথের প্রতি কী তাঁহার ভালবাসা! তিনি মিষ্ট ভাষায় বুঝাইয়া নরেন্দ্রনাথকে অনুনয় করিলে, নরেন্দ্রনাথ যাইতে বাধ্য হইল। সে কোঁচার কাপড় গায়ে দিয়া, চটি-জুতা পরিয়া, রামদাদার বাড়িতে গেল। বৈঠকখানার দক্ষিণদিকের দরজার কাছে, পরমহংস মশাই-এর গালিচাখানির সম্মুখে গিয়া সে বসিল। তখনো তাহার অভিমান ছিল, কিন্তু শিষ্টাচারের খাতিরে পরমহংস মশাইকে ঢিপ করিয়া একটি গড় করিল - প্রণাম করিতে হয়, সেইজন্য প্রণাম করিল মাত্র। পরমহংস মশাই অতি সস্নেহে নরেন্দ্রনাথের মাথায় হাত বুলাইয়া দিতে দিতে বলিতে লাগিলেন, "তুমি আস নি কেন এতক্ষণ? তুমি না এলে যে আসর জমে না। আমরা হলুম নর, তুমি যে নরের ইন্দ্র।" এইরূপ অনেক মিষ্ট কথায় তিনি তাহাকে সান্ত্বনা দিতে লাগিলেন। লোকজন অনেক হওয়ায় ঘরটি বড় গরম হইয়াছিল। নরেন্দ্রনাথ মিনিট কয়েক ঘরে থাকিয়া বলিল, "ঘরটা বড় গরম, আমি বাইরে গিয়ে বসি।" এই বলিয়া সে রাস্তার বেঞ্চিতে গিয়া হাওয়ায় বসিল। অল্পক্ষণ পরেই তাহার মাথার যন্ত্রণা কমিয়া গেল। নরেন্দ্রনাথের প্রতি পরমহংস মশাই-এর কী ঐকান্তিক ভালোবাসা! এত লোক উপস্থিত ছিলেন, তাঁহারা সকলেই তাঁহাকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করিতেন এবং তাঁহার সেবা করিতেন, কিন্তু তাহা হইলেও পরমহংস মশাই-এর মন তত প্রসন্ন ছিল না। কারণ, নরেন্দ্রনাথ উপস্থিত না থাকাতে তিনি একেবারে চঞ্চল হইয়া পড়িয়াছিলেন, যেন কোনো কিছু তাঁহার ভাল লাগিতেছিল না।

আমাদের এই সময়কার অবস্থার একটি ঘটনা উল্লেখ করিতেছি।

মা একখানি চেলির কাপড় পরিয়া আহ্নিক করিতেন। কাপড়খানি ছিঁড়িয়া যাওয়ায় তিনি নরেন্দ্রনাথকে বলেন যে, একখানি চেলির বা গরদের কাপড় হইলে তাঁহার আহ্নিক করার সুবিধা হয়। নরেন্দ্রনাথের তখন কোনো কাজ-কর্ম ছিল না, কোথা হইতে সে কাপড় দিবে? কাপড় দিবার ক্ষমতা নাই জানিয়া নরেন্দ্রনাথ মাথা হেঁট করিয়া মা'র সম্মুখ হইতে বিষণ্ণ হইয়া চলিয়া গেল, কোন কথার উত্তর দিল না।

এক মারোয়াড়ী ভদ্রলোক এই সময়ে পরমহংস মশাইকে একখানি গরদের কাপড় ও একটি বিকানিরের মিছরির থালা দিয়া প্রণাম করিয়া যান। থালাখানির মাঝখানে ডুমো ডুমো মিছরি দিয়া ভরতি করা। এখন সে রকম মিছরির থালা আর দেখিতে পাওয়া যায় না। খুব উৎকৃষ্ট জিনিস বলিয়াই মারোয়াড়ী ভদ্রলোকটি উহা পরমহংস মশাইকে দিয়াছিলেন। নরেন্দ্রনাথ ইহার দুই-এক দিন পরে দক্ষিণেশ্বরে যায়। পরমহংস মশাই জিদ করিতে লাগিলেন, "গরদের কাপড়, মিছরির থালা তুই নিয়ে যা।" নরেন্দ্রনাথ তাঁহার কথায় কিছুতেই সম্মত হইল না। অবশেষে পরমহংস মশাই বলিলেন, "তুই গরদখানা নে, তোর মা পরে আহ্নিক করবেন!" এই কথা শুনিয়া নরেন্দ্রনাথ বিস্মিত হইয়া তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। সে ভাবিতে লাগিল - ঠিক কথাই তো, বাড়িতে ঠিক এই কথাই তো হইয়াছিল। তখন সে আপত্তি না করিয়া নীরব হইয়া রহিল। কিন্তু জিনিসটি নিজে হাতে লইল না, চলিয়া আসিল।

দুই-এক দিনের মধ্যেই পরমহংস মশাই রামলালদাদাকে বলিলেন, "রামলাল, তুমি শীগ্গির করে খেয়ে নাও। এই গরদখানা আর মিছরির থালাখানা শিমলেয় গিয়ে নরেনের মা'র হাতে দিয়ে আসবে, অপরের হাতে দিও না।"

রামলালদাদা তাঁহার নির্দেশমতো শিমলায় আসিলেন। তখন গরমিকাল, বড় রৌদ্র, বেলা এগারোটা হইয়া গিয়াছিল। তিনি আসিয়া আমাকে বাহিরের ঘরে ডাকিয়া সমস্ত কথা বলিলেন। আমি অগত্যা মাকে ডাকিয়া আনিলাম। রামলালদাদা মা'র কাছে সমস্ত কথা বলিয়া তাঁহার হাতে সেই গরদের কাপড়খানি ও মিছরির থালাখানি দিলেন। মা হাসিয়া বলিলেন, "এখানে কথা হয়েছে, আর দক্ষিণেশ্বরে তখনই টেলিগ্রাফ হল!"

অবশেষে আমাদের সংসারে অতিশয় কষ্ট আসিল। নরেন্দ্রনাথ তাহাতে একেবারে বিচলিত হইয়া পড়িল। কি উপায়ে সে যে সংসার চালাইতে পারিবে, তাহা স্থির করিতে না পারিয়া একেবারে বিষণ্ণ হইয়া পড়িল। এই সময় সে কাহারো সহিত মিশিত না। তাহার পূর্বকার প্রফুল্ল ভাব একেবারে চলিয়া গেল; সে ম্লান হইয়া পড়িল। একদিন সে দক্ষিণেশ্বরে পরমহংস মশাইকে বলিল, "আপনি মাকে বলুন, যাতে আমার মা-ভাইদের খাওয়া-পরার কষ্ট দূর হয়। এত কষ্ট আর সহ্য করা যায় না!" পরমহংস মশাই বলিলেন, "তুই মা কালীকে প্রণাম করে যা চাইবি, তাই পাবি।" নরেন্দ্রনাথ কালীর মন্দিরে যাইয়া সংসারের অভাবমোচনের জন্য মা কালীর কাছে প্রার্থনা করিবে, এইরূপ মনস্থ করিয়া পরমহংস মশাই-এর ঘর হইতে বাহির হইল। উঠান দিয়া যাইবার সময় সে এক প্রকার গাঢ় নেশায় অভিভূত হইয়া পড়িল। মন্দিরে যাইয়া মা কালীকে প্রণাম করিয়া সংকল্পিত ইচ্ছাসকল ভুলিয়া গিয়া বলিতে লাগিল, "মা, আমায় বিবেক-বৈরাগ্য দাও।" তাহার পর, পরমহংস মশাই-এর ঘরে ফিরিয়া আসিলে তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, "কি রে, মা'র কাছে প্রার্থনা করেছিস?" নরেন্দ্রনাথ বলিল, "মশাই, ভুলে গেছি।" পরমহংস মশাই বলিলেন, "যা, ফের যা।" নরেন্দ্রনাথ পুনরায় গিয়া সকল কথা ভুলিয়া গিয়া বলিল, "মা, আমায় বিবেক-বৈরাগ্য দাও।" নরেন্দ্রনাথ মন্দির হইতে ফিরিয়া আসিলে পরমহংস মশাই পুনরায় জিজ্ঞাসা করিলেন, "কিরে, বলেছিস তো?" নরেন্দ্রনাথ উত্তর করিল, "না মশাই, ভুলে গেছি।" পরমহংস মশাই পুনরায় তাহাকে মন্দিরে মা কালীর কাছে যাইয়া প্রণাম করিয়া প্রার্থনা করিতে বলিলেন। নরেন্দ্রনাথও তাঁহার নির্দেশমতো মন্দিরে গিয়া প্রার্থনা করিল; কিন্তু সেই একই প্রার্থনা - "মা, আমায় বিবেক-বৈরাগ্য দাও।" মন্দিরের বাহিরে আসিয়া সে ভাবিল, নিশ্চয়ই পরমহংস মশাই-এর জন্য এইরূপ ভুল হইতেছে। পরমহংস মশাই-এর কাছে ফিরিয়া আসিয়া সে বলিল, "আমি মা কালীকে প্রণাম করতে গিয়ে সব ভুলে গেলুম, এখন আপনাকে মাকে জানাতে হবে।" এইরূপ করিবার জন্য পরমহংস মশাইকে সে ধরিয়া বসিল। পরমহংস মশাই তখন বলিলেন, "তা আমি কি করবো? তুই বলতে পারলি নি, তোর মনে এল না? - ওরে, তোর অদেষ্টে সংসার-সুখ নেই, তা আমি কি করবো! যা হোক, তোদের সংসারে মোটা ভাত-কাপড়ের অভাব হবে না।"

নরেন্দ্রনাথ ইহার পর হইতে সংসারের জন্য আর চিন্তা করিত না বা করিবার সামর্থ্যও তাহার ছিল না। সংসারের কষ্ট আরো ভীষণ হইয়া উঠিল। নরেন্দ্রনাথ পরমহংস মশাইকে সংসারের কোনো কিছু কথা আর না বলিলেও, পরমহংস মশাই কিন্তু মনে মনে এ বিষয় চিন্তা করিতেন, এবং অপরের কাছে নরেন্দ্রনাথের সংসারের অনটনের কথা বলিয়া দুঃখ করিতেন। নরেন্দ্রনাথের সংসারের অতিশয় কষ্ট জানিয়া মাস্টারমশাই1 এই সময় একশত টাকা দিয়াছিলেন। তাহাতে মাসতিনেক কোনো রকমে চলিয়াছিল। এই জন্য পরলোকগত মাস্টারমশাই-এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতেছি। এ কথা অপর কেহই জানেন না। এখন এ সকল কথা অপ্রকাশিত রাখিবার প্রয়োজন নাই।

ভবিষ্য জীবনে নরেন্দ্রনাথ যে কি করিবে, তাহা এ সময়ে সে স্থির করিতে পারিতেছিল না। বাহ্যিক ও আনুষঙ্গিক ঘটনাসমূহ এক প্রকার, আবার নিজের ভিতরটা আর এক প্রকার জিনিস চাহিতেছে। এইরূপ সংযোগক্ষেত্রে সে যে কোন্ পথে যাইবে, তাহা বুঝিতে পারিতেছিল না। পরমহংস মশাই কিন্তু তাহার ভবিষ্য জীবন সম্বন্ধে একটু আভাস দিয়াছিলেন। কালীর মন্দিরে প্রার্থনারূপ ব্যাপারটি নরেন্দ্রনাথের জীবনের স্রোত এক বিশেষ দিকে ফিরাইয়া দিয়াছিল। নরেন্দ্রনাথ মা কালীকে প্রণাম করিয়া যাহা আকাঙ্ক্ষা করিয়াছিল তাহাই তাহার ভবিষ্য জীবনে ফলিয়াছিল। আর পরমহংস মশাই নরেন্দ্রনাথের বিষয় যাহা ইঙ্গিত করিয়াছিলেন, তাহাও সত্য হইয়াছিল। কিন্তু নরেন্দ্রনাথ তখন বুঝিতে পারে নাই যে, তাহার ভবিষ্য জীবন কিরূপ হইবে বা তাহাকে কি কাজ করিতে হইবে।

সামান্য নরেন্দ্রনাথ কি করিয়া বিশ্ববিশ্রুত বিবেকানন্দ হইল - এ বিষয়টি বিশেষ করিয়া চিন্তা করা আবশ্যক। বিবেকানন্দের জীবনের প্রত্যেক ঘটনা বা প্রত্যেক সোপান, বিবেকানন্দের মনোবৃত্তির পরিবর্তন, প্রভৃতি সকল বিষয় বিশেষ করিয়া অনুধ্যান করা আবশ্যক। বিবেকানন্দ আকাশ হইতেও পড়েন নাই বা এক দিনেও তৈয়ার হন নাই। জীবনে উচ্চে উঠিতে হইলে, ধাপে ধাপে উঠিতে হয়। নানা প্রকার ঝঞ্ঝা ও বিপদ, নানা প্রকার বাধা-অন্তরায় অতিক্রম করিয়া উচ্চে উঠিতে হয়। এই ঝঞ্ঝা ও বিপদ বা অন্ধকারে কাহারো কিছু ভয় করিবার নাই। জীবনের স্রোত এই রকমই হইয়া থাকে, হতাশ হইবার কারণ নাই। জীবনের পথ অতীব কণ্টকাকীর্ণ, দুর্গম ও অন্ধকারময়। প্রত্যেককেই এই পথ দিয়া চলিতে হয়। কিন্তু একাগ্রতা ও আত্মনির্ভরতা থাকিলে, সাধারণ লোকেও অনেক উচ্চে উঠিতে পারে।

পরমহংস মশাই নরেন্দ্রনাথকে যে কি চক্ষে দেখিতেন, তাহা আরো দু-একটি ঘটনা উল্লেখ করিলেই বুঝা যাইবে।

এক দিন একজন লোক পরমহংস মশাইকে বলিয়াছিলেন, "আপনি নরেনকে এত ভালবাসেন কেন? নিজের ছোট হুঁকোয় করে নরেনকে তামাক খেতে দিলেন, হুঁকোটা যে এঁটো হয়ে গেল। ও যে হোটেলে খায়, ওর এঁটো কি খেতে আছে?" এইরূপ মাতব্বরী করিয়া তিনি কথা বলিতে লাগিলেন। পরমহংস মশাই তাঁহার কথা শুনিয়া বড় বিরক্ত হইয়া বলিলেন, "ওরে শালা, তোর কি রে? নরেন হোটেলে খাক বা যাই খাক, তাতে তোর কি? তুই শালা যদি হবিষ্যিও খাস, আর নরেন যদি হোটেলে খায়, তা হলেও তুই নরেনের সমান হতে পারবি নি।" এইরূপ তাঁহাকে খুব ভর্ৎসনা করিলেন।

এক দিন এক মারোয়াড়ী ব্যক্তি পরমহংস মশাইকে খুব ভাল কালাকান্দ বরফি দিয়া যান। যুবা যোগেন বলিল, "দিন না মশাই, আমি খাব।" পরমহংস মশাই বলিলেন, "ওদের সংকল্প করা জিনিস, ও খাস নি পেট ছেড়ে দেবে; ও শুধু নরেন খেতে পারে।" যুবা যোগেন বলিল, "আমরা সব খেতে পারি, আমাদের ওতে কিছু আসে যায় না। নরেন কায়েতের ছেলে, ও যদি খেয়ে সহ্য করতে পারে তো, আমরা সাবর্ণ-চৌধুরী2 বামুন, জমিদার, সব সহ্য করতে পারি।"

যোগেনের বাড়ি কালীমন্দিরের নিকটেই ছিল। একদিন যোগেনের পিতা চৌধুরী মশাই, মন্দিরের বাগানে আসিয়া নেবু তুলিয়া লইতে ছিলেন। পরমহংস মশাই জিজ্ঞাসা করিলেন, "যোগেন আসে না কেন?" চৌধুরী মশাই বলিলেন, "তার পেট ছেড়ে দিয়েছে, তাই নেবু নিয়ে যাচ্ছি।"

কয়েক দিন পর যুবা যোগেন আসিলে, পরমহংস মশাই বলিলেন, "দেখলি, মারোয়াড়ীদের সংকল্প করা জিনিস খেলে পেট ছেড়ে দেয়!"

মারোয়াড়ীদের সংকল্প করা জিনিস পরমহংস মশাই নিজেও খাইতেন না এবং একমাত্র নরেন্দ্রনাথ ব্যতীত আত্মগোষ্ঠীর অপর কাহাকেও দিতেন না। তিনি বলিতেন, "নরেন খেতে পারে; ওর ভেতরে আগুন জ্বলছে, কাঁচা কলাগাছ দিলেও পুড়ে ছাই হয়ে যায়।"

আর একটি ঘটনার উল্লেখ করিতেছি।

হৃদু মুখুজ্যের কাছে শুনিয়াছিলাম যে, পরমহংস মশাই বলিয়াছিলেন, "দেখ্, যখন আমি খাবারের আগভাগ অপরকে দিয়ে খাব, তখন জানবি যে আমার দেহ আর বেশি দিন থাকবে না।" এই কথা শ্রীশ্রীমাঠাকরুন3 ও হৃদু মুখুজ্যে জানিতেন। পরমহংস মশাই নিজের আহার করিবার জিনিস নিবেদন করিয়া প্রথমে নিজে আগভাগ লইতেন, পরে অপরকে দিতেন। হৃদু মুখুজ্যে বলিয়াছিলেন, "এক দিন নরেন দক্ষিণেশ্বরে গেছে। বিকেলে মামাকে জল খাওয়ার জন্যে গুটিকতক সন্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামা আগে নরেনকে সন্দেশ খেতে দিলেন। আমার বুকটা কেঁপে উঠল। আমি বুঝতে পারলুম, তিনি আর দেহ রাখবেন না। এই কথা মাঠাকরুনকে জানালুম; তিনিও বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন। পরে দেখলুম, তাঁর কথা ঠিক হয়েছে। অল্প দিন পরেই তিনি অসুস্থ হলেন; তাঁর দেহ গেল।" হৃদু মুখুজ্যে বড় ব্যথিত হইয়া এই বিষয়টি আমাকে কয়েক বার বলিয়াছিলেন। এ স্থলে জানা আবশ্যক যে, পরমহংস মশাই অপর কাহাকেও খাবারের আগভাগ দেন নাই।

হৃদু মুখুজ্যের কথাবার্তা শুনিয়া ও ভাব-ভঙ্গী দেখিয়া বুঝিয়াছিলাম যে, পরমহংস মশাই যেন নরেন্দ্রনাথের ভিতর আপনার প্রতিবিম্ব, প্রতিরূপ বা সত্তা দর্শন করিয়াছিলেন। সেইজন্য অপর দেহকে বা দেহের অভ্যন্তরস্থিত সত্তাকে খাদ্যদ্রব্য প্রদান করিয়াছিলেন। ইহা যে ভুল, এ কথা বলা যায় না। মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই হইল, নিজের দেহ বা আধার চলিয়া যাইলে, নিজ সত্তাকে অপর আধার বা শরীরে বিদ্যমান রাখা। ইহা হইল Continuance of one's own existence - নিজ সত্তার ধারাবাহিকতা। গুরুপরম্পরায় এই শক্তি আধার হইতে আধারে চলিয়া আসিতেছে, আসিবেও। ভালবাসা, স্নেহ-মমতা, কৃপা করা যাহাকে বলে, ইহা সেরূপ নয়। ইহা হইল Self-reflection - আত্মপ্রতিবিম্ব বা আত্মপ্রতীক সম্মুখে দেখা। একই শক্তি বা একই সত্তা, দুই আধারে সমানভাবে রহিয়াছে। একটি শক্তি অপর শক্তির প্রতিবিম্ব মাত্র, ভিন্ন আধারে অবস্থান করিতেছে মাত্র। এইজন্য পরমহংস মশাই নিজ আহারের আগভাগ নরেন্দ্রনাথকে দিয়াছিলেন। সাধারণ লোকে ইহাকে বাহ্যিক অনুষ্ঠান বা প্রক্রিয়া মাত্র বলিয়া বুঝিবে। কিন্তু চিন্তা করিলে ইহার ভিতর যে নিগূঢ় অর্থ আছে, তাহা বেশ স্পষ্ট বুঝা যায়। "প্রবর্তিতো দীপ ইব প্রদীপাৎ" অর্থাৎ একটি প্রদীপ হইতে অপর একটি প্রদীপ জ্বালাইয়া লইলে, উভয়ের মধ্যে যেমন কোনো পার্থক্য থাকে না ইহাও ঠিক সেইরূপ।

পরমহংস মশাই যাহা বলিয়াছিলেন, তাহাই হইল। ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে, গরমিকালে পরমহংস মশাই-এর শরীর অসুস্থ হয়। চিকিৎসার জন্য তাঁহাকে দক্ষিণেশ্বর হইতে কলিকাতায় আনা হইল। প্রথমে বলরামবাবুর বাড়িতে ও শ্যামপুকুরের একটি বাড়িতে তাঁহাকে আনিয়া রাখা হইয়াছিল। শেষকালে, তাঁহাকে কাশীপুরের বাগানে আনা হয়। প্রকৃতপক্ষে কাশীপুরের বাগানেই পরমহংস মশাই-এর আত্মগোষ্ঠী বিশেষরূপে গড়িয়া উঠিয়াছিল। এই গোষ্ঠী, ত্যাগী ভক্ত ও সাধারণ ভক্ত, এই দুই ভাগে বিভক্ত হইয়াছিল। পরে ইঁহারা সন্ন্যাসী ও গৃহী ভক্ত নামে অভিহিত হন। ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দে, এই কাশীপুরের বাগানেই পরমহংস মশাই দেহরক্ষা করেন।


1. শ্রীযুত মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত।

2. সাবর্ণি গোত্র।

3. শ্রীরামকৃষ্ণের সহধর্মিণী, শ্রীসারদামণি দেবী।