Thursday, May 24, 2018

পরমহংস মশাই

পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসিলে প্রথমে যেমন জন চল্লিশ লোক হইত এবং রামদাদা তাঁহাকে বাড়িতে লইয়া আসার জন্য সশঙ্ক থাকিতেন, পাছে কেহ তাঁহাকে অবজ্ঞা বা উপহাস করে - ক্রমে ক্রমে সেই ভাব চলিয়া যাইল। পরমহংস মশাইকে সকল লোকে শ্রদ্ধা করুক বা না করুক, তাঁহার প্রতি বিদ্বেষভাব তাহাদের আর রহিল না। লোকসংখ্যা আরো বাড়িতে লাগিল; পঞ্চাশ হইতে এক শ', দেড় শ', এমন কি তিন শ' পর্যন্ত লোক আসিতে লাগিল। ধীরে ধীরে, অনেকেই তাঁহাকে একটু শ্রদ্ধা-ভক্তি করিতে লাগিল, এবং তাঁহাকে 'দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস' বা 'রামডাক্তারের গুরু' না বলিয়া, 'পরমহংস মশাই' বলিতে লাগিল। এমন কি পরমহংস মশাইকে যে ব্যক্তি বিশেষ শ্রদ্ধা-ভক্তি করিত না, তাহার কাছেও যদি কেহ পরমহংস মশাই-এর সম্বন্ধে বিদ্রূপ করিত, তাহা হইলে সে চটিয়া যাইত। ব্রাহ্মণেরা প্রথমে প্রকাশ্যে তাঁহার প্রতি অবজ্ঞাভাব দেখাইতেন; ক্রমে তাঁহারা প্রকাশ্যে আর সেরূপ ভাব দেখাইতেন না; তবে সমাজের ভয়ে তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতেন না। কারণ ভট্টাচার্য ব্রাহ্মণ হইয়া তাঁহারা কৈবর্তদের পূজারীর সহিত কিরূপে একত্র বসিবেন ও তাঁহাকে প্রণাম করিবেন। এই ছিল তাঁহাদের মনের ভাব।

পরমহংস মশাই-এর প্রতি পাড়ার সকল লোকের পূর্বকার ভাব চলিয়া গিয়া, বেশ একটি শ্রদ্ধার ভাব আসিতে লাগিল। তিনি যেন পাড়ার লোক, নিজেদের লোক ও সকলের শ্রদ্ধেয়, আর তাঁহার কাছে যাঁহারা যাইতেন, তাঁহারা সকলেই যে স্বগোষ্ঠীর লোক, এই ভাবটিও ধীরে ধীরে আসিতে লাগিল। এই স্বগোষ্ঠীর ভিতর বা আপনা-আপনির ভিতর পরস্পরের বাড়িতে খাওয়া চলিত। জাতাজাতির গোঁড়ামি আপনা-আপনির ভিতর কমিয়া যাইল। গোষ্ঠীর লোকের মধ্যে আর একটি ভাব আসিল - যে ব্যক্তি পরমহংস মশাই-এর কাছে যায়, তাহাকে বিশ্বাস করা যাইতে পারে। অজ্ঞাতসারে একটি সঙ্ঘ গড়িয়া উঠিতে লাগিল। পরমহংস মশাই রামদাদার বাড়িতে আসিলে যাঁহারা সর্বদা সেখানে আসিতেন তাঁহারা তাঁহাকে বেশ শ্রদ্ধা-ভক্তি করিতে লাগিলেন। শ্রদ্ধা-ভক্তি যাঁহারা করিতেন না বা কোনো প্রকার চঞ্চলভাবের কথা কহিতেন, তাঁহাদের কাছ হইতে এই গোষ্ঠীর লোকেরা একটু তফাৎ থাকিতে লাগিলেন; এবং যাঁহারা শ্রদ্ধা-ভক্তি করিতেন, তাঁহাদের সহিত বসিয়া কথাবার্তা কহিতেন। পরমহংস মশাইকে যাঁহারা রামদাদার বাড়িতে দেখিতে আসিতেন, তাঁহাদের পরস্পরের মধ্যে বেশ একটি টানও আসিতে লাগিল। এমন একটি টান আসিল যে, পরস্পরকে দেখিতে বা পরমহংস মশাই-এর সম্বন্ধে দুটো কথা কহিতে সকলেই যেন আনন্দ পাইত। স্বগোষ্ঠীর সকলের মধ্যে পরমহংস মশাই-এর বিষয় কথাবার্তা হইত এবং তিনি যে কথা বলিতেন, সেই কথাটির কি অর্থ ও কি তাৎপর্য - এই সকল বিষয় আলোচনা হইত। অপর কোনো কথাই সেই সময় হইত না; বা কেহ অন্য কোন কথা কহিতে পছন্দও করিত না। মোট কথা তাঁহার নাম, তাঁহার প্রসঙ্গ, তাঁহার বাসস্থান, তাঁহার প্রিয় ব্যক্তি - এ সকলই যেন মধুর বলিয়া বোধ হইত। ইহা বিশেষরূপে লক্ষ্য করিতাম যে, পণ্ডিত-মূর্খ, ধনী-দরিদ্র, এ সকল ভাব কিছুই থাকিত না। পরমহংস মশাই এত উচ্চ অবস্থা হইতে কথা কহিতেন যে, পণ্ডিত - মূর্খ হইত, মূর্খ - পণ্ডিত হইত, ধনী - গরিব হইত এবং গরিব - ধনী হইত। এইজন্যই পুনঃপুনঃ বলিতেছি যে, তাঁহার ভিতর হইতে কী একটি শক্তি বাহির হইয়া সকলকে অভিভূত করিয়া ফেলিত, সকলের মধ্যে এক নূতন প্রাণের সৃষ্টি করিত এবং সকলের চিন্তাধারা ও ভাবস্রোত অন্য প্রকার করিয়া দিত; এমন কি, নবীনতা ও প্রবীণতার পার্থক্যবোধও কিছু থাকিত না; যেন অশ্বত্থ গাছ ও দূর্বাঘাস একই হইয়া যাইত।

No comments:

Post a Comment