Wednesday, May 23, 2018

গঙ্গার ঘাটে কেশববাবুর বক্তৃতা

হৃদু মুখুজ্যের1 কাছে এক দিন শুনিয়াছিলাম যে, গরমিকালে, এক দিন শনিবারে কেশববাবু ষ্টীমার করিয়া স-দলবলে দক্ষিণেশ্বরে গিয়াছিলেন। তিনি তো এত জনসমাগম হইয়াছে দেখিয়া, খুব আনন্দিত হইলেন। তাহার পর তিনি অনুনয় করায়, কেশববাবু গঙ্গার ধারে বড় ঘাটটিতে গিয়া, গঙ্গার দিকে মুখ করিয়া, বক্তৃতা দিতে লাগিলেন। হৃদু মুখুজ্যে বলিয়াছিলেন, "কেশববাবুর কী বক্তৃতার ক্ষমতা, মুখ দিয়ে যেন মল্লিকে ফুল বেরুতে লাগলো! অনর্গল তিনি বলতে লাগলেন। কেশববাবু টাউন হলে লিক্চার দিয়ে থাকেন, সে তো কখনো শোনা হয় নি; সেজন্য, কেশববাবুর লিক্চার শোনবার এত আগ্রহ হয়েছিল।"

পরমহংস মশাইও বক্তৃতা শুনিতেছিলেন, কিন্তু খানিকক্ষণ পরেই তিনি বিরক্ত হইয়া নিজের ঘরে চলিয়া যাইলেন। পরমহংস মশাইকে চলিয়া যাইতে দেখিয়া কেশববাবু ভাবিলেন যে তাহা হইলে বোধ হয় বক্তৃতায় কোনো ত্রুটি হইয়াছে। কিন্তু অন্যান্য শ্রোতারা বলিতে লাগিল, "লোকটা অশিক্ষিত; মুক্খু, কোনো-কিছু বোঝে না, তাই চলে গেল।"

কেশববাবু বক্তৃতা শেষ করিয়া পরমহংস মশাই-এর কাছে আসিলেন। সেখানে কথাবার্তা হইতেছে, এমন সময় কেশববাবু জিজ্ঞাসা করিলেন, "মশাই, কি ত্রুটি হয়েছে?" পরমহংস মশাই বলিলেন, "তুমি বলিলে: ভগবান, তুমি সমীরণ দিয়েছ, তরু-গুল্ম দিয়েছ। - এ সকল তো বিভূতির কথা। এ সব নিয়ে কথা কইবার দরকার কি? যদি এ সব বিভূতি তিনি নাই দিতেন, তা হলেও কি তিনি ভগবান হতেন না? বড়মানুষ হলেই কি তাঁকে বাপ বলবে; যদি তিনি গরিব হতেন, তা হলে কি তাঁকে বাপ বলবে না?" এইরূপ, 'গুণ' ও 'বস্তু'-র কথা, বিভূতি বা ঐশ্বর্যের অতীত হইলেন 'ব্রহ্ম', - এই সকল কথা হইতে লাগিল।

পর দিন রবিবার শিমলাতে এই কথাটি রটিয়া যাইল। তখন এত খবরের কাগজ ছিল না, সকল সংবাদ মুখে মুখে আসিত। বেলা নয়টা হইতে অনেক লোক গৌরমোহন মুখার্জী ষ্ট্রীটে আসিয়া জমা হইতে লাগিল, আর উন্মত্ত হইয়া এই কথা বলাবলি করিতে লাগিল; কারণ এই ভাবের কথা তখন কাহারো জানা ছিল না। আমাদের তখনকার সমস্ত সঞ্চিত জ্ঞান ছিল - কথকের মুখে কিছু কথা শুনিয়া, আর বাইবেলের কথা শুনিয়া; ইহার বাহিরের কিছু কথা আমাদের জানা ছিল না, কেহ ভাবেও নাই। বিভূতি ও ঐশ্বর্যের উপর যে কিছু আছে, তখনকার দিনে এ কথাটি নূতন কথা। অবশ্য কেহই তখনো পর্যন্ত ইহার বিশেষ তাৎপর্য বুঝিতে পারে নাই; তবে সকলেই কেবল বলিতে লাগিল, "বড়মানুষ হলেই কি বাপ হবে, আর গরিব হলে কি বাপ হবে না?" কথাটি নূতন হওয়ায় শিমলাতে লোকের ভিতর এইরূপ উত্তেজনার সৃষ্টি হইয়াছিল। এখনকার দিনে এরূপ কথা খুব বড় কথা নয় কিন্তু তখনকার দিনে, ইহা অতি আশ্চর্যের কথা। আর সেই সঙ্গে একটি কথা উঠিল, "দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস মশাই কেশব সেনের মাথা ভেঙে দিয়েছেন। কেশববাবু আর মাথা তুলে কথা কইতে পারেন না।" বেলা এগারোটা সাড়ে-এগারোটা পর্যন্ত লোকেরা রাস্তায় জটলা করিয়া মত্ত হইয়া এই সকল কথাই বার বার বলাবলি করিতে লাগিল। রবিবারের সকালবেলা বলিয়া জটলা কিছু বেশি হইয়াছিল, বিশ-পঁচিশ জন লোক হইবে। শিমলার লোকেরা কিছু দিন পূর্বে যে ব্যক্তিকে অবজ্ঞা করিত, অশিক্ষিত ও বিকৃতমস্তিষ্ক বলিয়া উপহাস করিত, এখন তাঁহারই এই সব কথা শুনিয়া তাহারা স্তম্ভিত হইয়া গেল। পরমহংস মশাইকে যাহারা উপেক্ষা করিত এবং সামান্য লোক বলিয়া শ্রদ্ধা করিত না, তাহারা সেদিন হইতে পরমহংস মশাই-এর প্রতি নিজেদের মনের ভাবগতিক ফিরাইল। কেশববাবুর যে একচ্ছত্র প্রতিপত্তি ছিল, তাহার কিঞ্চিৎ হ্রাস হইল। এই দিন হইতে পরমহংস মশাই-এর প্রতি শিমলার লোকের একটু বিশেষ শ্রদ্ধা আসিল এবং তিনি একজন বিশিষ্ট লোক বলিয়া পরিগণিত হইতে লাগিলেন।


1. শ্রীযুত হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায়, শ্রীরামকৃষ্ণের ভাগিনেয়।

No comments:

Post a Comment