সাধারণতঃ লোকে স্থূল-স্নায়ুপুঞ্জে অবস্থান করে এবং দৈনন্দিন কার্য করিয়া থাকে। এই অবস্থায় সাধারণ লোক ও একজন বিশিষ্ট লোকের মধ্যে কোনো-ই পার্থক্য থাকে না। সাধারণ লোক স্থূল-স্নায়ুস্তর হইতে অন্য স্তরে যাইতে পারে না। কিন্তু মহাপুরুষেরা ইচ্ছা করিলে স্থূল-স্নায়ু বা স্থূল-শরীর হইতে সূক্ষ্ম-স্নায়ু বা সূক্ষ্ম-শরীরে যাইতে পারেন; এমন কি তাঁহারা সূক্ষ্ম-স্নায়ু বা সূক্ষ্ম-শরীর হইতে, কারণ-স্নায়ু বা কারণ-শরীরে যাইতে পারেন; কারণ-শরীর হইতে মহাকারণ এবং মহাকারণ হইতে মহাব্যোমেও যাইতে পারেন। সাধারণ লোক স্থূল অবস্থা হইতে আর ঊর্ধ্বগামী হইতে পারেন না। ইহাই হইল সাধারণ লোক ও মহাপুরুষদিগের মধ্যে পার্থক্যের কারণ।
পরমহংস মশাই যখন স্থূল-শরীরে থাকিতেন তখন তাঁহাকে একজন সাধারণ লোকের মতো দেখা যাইত। লক্ষ্য করিতাম তাঁহার কথাবার্তা কিছু জড়ানো তোতলার মতো। অল্প-বয়স্ক বালকেরা সেই সকল কথাবার্তা শুনিয়া হাসিয়া ফেলিত। দেখিতাম যে, তিনি পাড়াগেঁয়ে ভাষায় নানা প্রকার হাসি-কৌতুক করিতেছেন, যাহা কলিকাতার শিক্ষিত সমাজের রুচি-বিগর্হিত। এইজন্য অনেক শিক্ষিত লোক তাঁহাকে উপহাস ও অবজ্ঞা করিত। কিন্তু, এই পাড়াগেঁয়ে লোকই সহসা তাঁহার মনোবৃত্তি পরিবর্তন করিয়া অপর এক রূপ ধারণ করিতে পারিতেন এবং তখন তিনি যে কত উচ্চে উঠিতেন তাহা বুঝিতে পারা যাইত না। সাধারণ অবস্থা হইতে অতি দ্রুতবেগে তাঁহার বিবর্তন হইত। একজন অশিক্ষিত পাড়াগেঁয়ে লোক সহসা কিরূপ হইয়া যাইতে লাগিল। হাতের আঙুলের ও পেশীর স্নায়ুসকল স্থির ও নিশ্চল হইল; চোখের পাতা নিস্পন্দ; দৃষ্টি - একাগ্র, স্থির; মুখের স্নায়ুসকল - দৃঢ়, গম্ভীর ও আজ্ঞাপ্রদ এবং আরো অনেক প্রকার উচ্চ ভাব যেন একসঙ্গে বিকাশ পাইতে লাগিল! একেবারে যেন স্বতন্ত্র ব্যক্তি, পূর্ব ব্যক্তি হইতে অসীম পার্থক্য! এই সময় তাঁহার মুখ দেখিবার জন্য প্রয়াস পাইতাম। কিন্তু অনেক সময় মুখের আভা সহ্য করিতে পারা যাইত না।
দেখিতাম যে, এইরূপ স্থির ও সমাধিস্থ হইয়া যাইবার পূর্বে বা পরে, কি একটি একমাত্রাযুক্ত বা একযতিযুক্ত অস্ফুট শব্দ তিনি উচ্চারণ করিতেন, তাহা কিছু বুঝা যাইত না। এই এক অক্ষরের শব্দ উচ্চারণ করিতে করিতে তিনি স্থির হইয়া যাইতেন; আবার কখনো বা নিশ্চল অবস্থা হইতে সচল অবস্থায় আসিবার সময় এইরূপ শব্দ উচ্চারণ করিতেন। এক অক্ষরের এই শব্দ অস্ফুটভাবে উচ্চারণ করিতে করিতে, ধীরে ধীরে দেহের ভিতর মন আনিতেন। এই সময় দেখিতাম, হাত-পা যেমন পূর্বে স্থির হইয়া গিয়াছিল, এখন সে ভাবটি কাটিয়া গিয়া আঙ্গুলগুলি নরম হইল এবং ডান হাতের কাছে জলের গেলাসটি হইতে একটু জল খাইলেন - ধীরে ধীরে মন যেন দেহে নামিয়া আসিতে লাগিল। তাহার পর অনেক পরিমাণে সাধারণভাবে কথা কহিতে লাগিলেন কিন্তু তখনো অনেকটা ঘোর ঘোর ভাব থাকিত। ক্রমে ক্রমে কয়েক মিনিট পরে, বেশ সাধারণ লোকের মতো হইতেন।
পরমহংস মশাই-এর এই ভাবটি বা অবস্থাটি আমি অনেক বার দেখিয়াছি। এইজন্য বিষয়টি বিশেষ করিয়া এই স্থলে উল্লেখ করিলাম। অপর যাঁহারা ইহা দেখিয়াছেন এবং এখনো জীবিত আছেন, তাঁহারাও এ বিষয় বেশ স্মরণ করিতে পারিবেন। তাঁহার সেই সময়কার মুখের ভাব দেখিয়া বেশ বুঝা যাইত যে, তিনি যেন কি একটি আশ্চর্য, অদ্ভুত ও নূতন জিনিস দেখিয়া সকলকে বলিতেছেন, "শীগ্গির শীগ্গির আয়, এই জিনিস দেখিবি আয়!" এইরূপ ভাব প্রকাশ করিতে করিতেই তাঁহার স্থূল-স্নায়ুর বা প্রাথমিক সূক্ষ্ম-স্নায়ুর ক্রিয়াসমূহ বন্ধ হইয়া যাইত, চিন্তাস্রোত বা বিকাশভাব একেবারে স্তম্ভিত হইয়া যাইত; কেবল মহাকারণ বা অতি সূক্ষ্ম-স্নায়ুর প্রক্রিয়া এবং চিত্ত-আকাশ ও চিৎ-আকাশের বিভিন্ন স্তরের প্রক্রিয়া চলিত। এইজন্য কণ্ঠ দিয়া এই একমাত্রাযুক্ত অস্ফুট ধ্বনি বাহির হইত। এই ধ্বনি প্রচলিত কোনো শব্দের মতো নয় আর ভাষা দিয়া যত না হউক কণ্ঠের স্বর, মুখের কান্তি ও আভা দিয়া, তিনি সেটি কিছু বিকাশ করিবার চেষ্টা করিতেন। এইটি অতি বিশেষ করিয়া চিন্তা করিবার বিষয়। স্বামীজী তাঁহার একটি গীতে এই অবস্থার বিষয় বর্ণনা করিয়াছেন:
"অস্ফুট মন-আকাশে, জগৎ-সংসার ভাসে,
ওঠে ভাসে ডোবে পুনঃ অহং-স্রোতে নিরন্তর।"
ইহা হইল অতি উচ্চ অবস্থার কথা। ইহা হইল 'বাণী'। ব্যক্ত ও অব্যক্তের সন্ধিস্থলে যাওয়া-আসা করিবার সময় এইরূপ বাণী নির্গত হইয়া থাকে। পরমহংস মশাই যখন নির্বিকল্প সমাধিতে যাইতেন, বা নির্বিকল্প সমাধি হইতে নামিতেন, ঠিক সেই সময় এইরূপ একটি বাণী তাঁহার কণ্ঠ হইতে নির্গত হইত। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের জীবনেও এইরূপ ভাবের কথা উল্লেখ আছে। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য ও পরমহংস মশাই-এর জীবনে এই ভাবটি দেখিতে পাই। অপর কোনো মহাপুরুষের জীবনে ঠিক এইরূপ ভাবের বিষয় উল্লেখ আছে বলিয়া জানি না।
প্রসঙ্গক্রমে এখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, মহাপুরুষদিগের যে-সকল উক্তি সাধারণতঃ লিপিবদ্ধ হইয়া ধর্মগ্রন্থরূপে জগতে প্রচলিত হয়, তাহা বিশেষ করিয়া অনুধাবন করিলে দেখিতে পাওয়া যায় যে, এক চিন্তা হইতে অপর এক চিন্তার মধ্যে একটি ফাঁক রহিয়া গিয়াছে; দার্শনিক প্রথা অনুযায়ী ধারাবাহিকরূপে তাহা লিখিত হয় নাই। ইহার কারণ এই যে, মহাপুরুষেরা যে সকল উচ্চ চিন্তা করিয়াছিলেন, সেখানে ভাষা চলে না। অপর দিকে উচ্চ অবস্থায় আরোহণকালে বা উচ্চ অবস্থা হইতে অবরোহণকালে, শক্তির সন্ধিস্থলে, তাঁহাদের কণ্ঠ হইতে যে একযতিযুক্ত গভীর ভাবব্যঞ্জক অস্ফুট শব্দ নির্গত হইয়াছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শ্রোতারা তাহার অর্থ বুঝিতে পারেন নাই বা বুঝিবার শক্তিও সকলের ছিল না। এইজন্য অপ্রয়োজনীয় বোধে তাহা পরিত্যক্ত হইয়াছে।
তাহার পর হইল মহাপুরুষগণ-কর্তৃক উক্ত - দার্শনিক মত। দার্শনিক মত হইল অতীব জটিল এবং উপলব্ধির বিষয়। মাত্র এক বা দুই ব্যক্তির জন্য তাহা কথিত হয়, সাধারণ লোকের নিকট দৈনন্দিন কার্যের বিধিনিষেধই হইল ধর্মের চরম অবস্থা বা পরাকাষ্ঠা - Summum bonum of religion। মহাপুরুষদিগের মনস্তত্ত্ব অনুধাবন করিলে দেখা যায় যে, বিধি-নিষেধ হইল ধর্ম-জীবনে অতি তুচ্ছ বিষয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, মহাপুরুষদিগের কণ্ঠ হইতে নিঃসৃত অস্ফুট শব্দ বা বাণী এবং তাঁহাদিগের উক্ত দার্শনিক মত বিলুপ্ত হইয়া যায় এবং যাহা অতি অকিঞ্চিৎকর বিষয় - বিধি-নিষেধ, তাহাই লিপিবদ্ধ হইয়া জগতে ধর্মগ্রন্থ বলিয়া প্রচলিত হয়। এইরূপ গ্রন্থে কোনটি মেধ্য কোনটি অমেধ্য, মাত্র ইহাই বিচার করা হয়। অবশ্য এই সকল ব্যাপার অনিবার্য ও চিরকালই থাকিবে। দার্শনিকগণ ও বৈজ্ঞানিকগণ কিন্তু এই বিধি-নিষেধের মোহে পড়েন না।
No comments:
Post a Comment