Friday, April 6, 2018

নির্বিকল্প সমাধিতে

দেখিতাম যে, পরমহংস মশাই সাধারণভাবে কথা কহিতেছেন, সহসা তাঁহার দেহের পরিবর্তন হইয়া যাইল! এই পরিবর্তন এত দ্রুত গতিতে হইত যে, শ্রোতৃগণ বা দর্শকগণ সেই গতির অনুসরণ করিতে পারিত না। অবশেষে তিনি স্থির ও নিষ্ক্রিয় হইয়া যাইলেন; হাতের নাড়ীর চলাচল বন্ধ হইয়া যাইল; হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হইল এবং শ্বাসও স্তম্ভিত হইয়া যাইল! এইরূপ অবস্থা বহু বার দেখিয়াছি। এমন কি একজন ডাক্তার পরমহংস মশাই-এর চোখে আঙুল দিয়া দেখিয়াছিলেন যে তাহাতে সংজ্ঞা বা বেদনা হয় কিনা। অবশ্য সেই অবিবেচক ডাক্তারকে সকলে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করিয়াছিলেন।

য়ুরোপীয় শারীরবিজ্ঞানে বলা হয় যে, হৃৎপিণ্ড, শ্বাসযন্ত্র প্রভৃতি হইল স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র - Automatic organ. অর্থাৎ ইচ্ছা করিয়া ইহাদিগের গতিরোধ করা যায় না। কিন্তু এ স্থলে স্পষ্ট দেখা যাইতেছে যে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রও স্তম্ভিত হইয়া যাইতেছে; কোনো ক্রিয়াই থাকিতেছে না।

পরমহংস মশাই-এর এইরূপ নিস্পন্দ অবস্থা বা সমাধি উপর্যুপরি হইত; ইহার কারণ নির্দেশ করিতে হইলে দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক মত অনুযায়ী বলিতে হয় যে, স্থূল-স্নায়ু-প্রক্রিয়া এক প্রকার এবং তাহার অভ্যন্তরস্থিত সূক্ষ্ম-স্নায়ুর প্রক্রিয়া আর এক প্রকার বা ঠিক বিপরীত প্রকার। ইহাই হইল বিপরীত গতিবাদের নিয়ম। স্থূল-স্নায়ুর যেমন বহির্মুখী বিকাশ হইবে, সূক্ষ্ম-স্নায়ুরও সেইরূপ অন্তর্মুখী বিকাশ হইবে; কিন্তু এই বিকাশ স্থূল-স্নায়ুর বিকাশের নিয়ম অনুযায়ী হয় না। এইরূপ ক্রমে, অতিসূক্ষ্ম-স্নায়ুর বা মহাকারণ-স্নায়ুর প্রক্রিয়া হইবে। এই অবস্থায় বহির্মুখী বা অন্তর্মুখী বলিয়া কোনো পার্থক্যদ্যোতক শব্দ প্রযোজ্য হয় না। কারণ, স্নায়ু দিয়া যে শক্তি প্রধাবিত হয় তাহাকে 'মন' বলে; এবং ভিন্ন ভিন্ন স্তরের স্নায়ু দিয়া যেরূপ শক্তি প্রধাবিত হইবে মন, চিন্তাশক্তি, দর্শন, জ্ঞান বা উপলব্ধি, সেইরূপ বিভিন্ন প্রকারের হইবে।

লন্ডনে রাত্রে বক্তৃতাকালে স্বামীজী একবার 'সমাধি'-র বিষয় বলিতে বলিতে নিজে সমাধিস্থ হইয়া যাইলেন। গুডউইন1 টেবিলে বসিয়া 'ক্ষিপ্রলিপি'-তে সকল কথা লিখিতেছিল। সে সহসা কাগজ ফেলিয়া দিয়া সম্মুখে আসিয়া স্বামীজীকে দেখিতে লাগিল। শ্রোতৃবৃন্দও তাঁহাদের চেয়ার ফেলিয়া স্বামীজীর কাছে গিয়া দেখিতে লাগিলেন। স্বামীজীর কোন শ্বাসও নাই, কোন স্পন্দনও নাই; নিস্পন্দ পুত্তলিকার মতো তিনি দাঁড়াইয়া আছেন। কয়েক মিনিট পর পুনরায় শ্বাস ফেলিয়া, যেখান পর্যন্ত বক্তৃতা হইয়াছিল ঠিক তাহার পরের ছত্র হইতে বক্তৃতা দিয়া যাইতে লাগিলেন; ভাব, ভাষা ও ব্যাকরণের কোনোই ত্রুটি হইল না। স্বামীজীর এইরূপ সমাধি-অবস্থা দেখিয়া দর্শকবৃন্দ অতিশয় আশ্চর্যান্বিত হইয়াছিলেন।

স্নায়ু-বিজ্ঞান হইল রাজযোগের অন্তর্গত। কিন্তু হঠযোগীরাও এই স্নায়ু-বিজ্ঞানের বহু প্রকার প্রক্রিয়া জানেন। কলিকাতার উপকণ্ঠে ভূকৈলাস রাজবাটীতে এক হঠযোগীকে দেখা গিয়াছিল। তিনি ভূগর্ভে এক মন্দিরের ভিতর বহু কাল যাবৎ, সম্ভবতঃ কয়েক শত বৎসর উপবিষ্ট ছিলেন। যখন পোর্ট ক্যানিং-এর রেলপথ খুঁড়িতে খুঁড়িতে সেই মন্দির বাহির হয়, তখন সেইখানে এই হঠযোগীকে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখিতে পাওয়া যায়। দেখিলে বয়স অনুমান বত্রিশ বৎসর বলিয়া বোধ হইত। কোঁকড়ানো কোঁকড়ানো দাড়ি ছিল। এই হঠযোগীর গায়ে আগুন পুরিয়া দেওয়াতেও তাঁহার কোনো সংজ্ঞা হয় নাই। এই হঠযোগীর ব্যাপার কলিকাতার তখনকার অনেকেই জানিতেন। আমাদের বাড়ির সকলে এই হঠযোগীকে দেখিতে যাইতেন, কিন্তু আমার তখন অল্প বয়স বলিয়া তাঁহারা আমাকে লইয়া যাইতেন না।

অপর একটি উদাহরণ এ স্থলে দেওয়া যাইতে পারে - বাবা হরিদাসের কথা। বাবা হরিদাস হঠযোগী ছিলেন। একবার তিনি মহারাজ রঞ্জিৎ সিং-এর রাজ্যে উপস্থিত হন। কোনো ব্যক্তি তাঁহার যৌগিক প্রক্রিয়ায় সন্দেহ প্রকাশ করায় বাবা হরিদাস, মহারাজ রঞ্জিত সিং-এর আদেশক্রমে যোগসাধনায় প্রবৃত্ত হন। তিনি দেহের সমস্ত ক্রিয়া বন্ধ করিয়া দিলেন। তখন বাবা হরিদাসকে পাথরের সিন্দুকের ভিতর পুরিয়া ভূগর্ভে প্রোথিত করা হইল এবং তাহার উপর গম বোনা হইল। গম পাকিলে কাটিয়া লওয়া হইল। তাহার পর, সিন্দুক উঠানো হইল। খুলিয়া দেখা গেল যে বাবা হরিদাস পূর্বের মতো শায়িত অবস্থায় রহিয়াছেন। তিনি উঠিয়া সাধারণ লোকের মতো কথাবার্তা কহিতে লাগিলেন। অনুমান করা যাইতে পারে যে তিনি প্রায় ছয় মাস কাল ঐরূপ প্রোথিত অবস্থায় ছিলেন।

কয়েক বৎসর পূর্বে, কলিকাতায় কয়েক জন হঠযোগী অল্পবিস্তর হঠযোগের প্রক্রিয়া দেখাইয়াছেন। হঠযোগীরা বলিয়া থাকেন যে, পুরুষাঙ্গ পর্যন্ত অভ্যন্তরস্থ করা যাইতে পারে।

যাহা হোক এখানে হঠযোগীদিগের কথা বলা উদ্দেশ্য নয়, স্নায়ু-বিজ্ঞানের কথা বলাই উদ্দেশ্য। পরমহংস মশাই কঠোর তপস্যা করিয়া স্নায়ুসমূহ এরূপ সঞ্চালিত করিতে পারিতেন যে, নিজে ইচ্ছামতো স্নায়ুর গতি ও প্রক্রিয়া পরিবর্তন করিতে সমর্থ হইতেন। এইজন্য তিনি যখন অতি সূক্ষ্ম-স্নায়ুতে চলিয়া যাইতেন, মহাকারণ বা মহাব্যোমে যাইতেন, তখন স্থূল-স্নায়ুর কোনরূপ প্রক্রিয়াই থাকিত না এবং দেহস্থিত যন্ত্রাদিরও কোনো ক্রিয়া হইত না। এইজন্য তিনি নিস্পন্দ হইয়া যাইতেন বা সমাধিস্থ হইয়া পড়িতেন।


1. শ্রীযুত জে. জে. গুডউইন, স্বামী বিবেকানন্দের পরম অনুরক্ত য়ুরোপীয় শিষ্য।

No comments:

Post a Comment